শিরোনাম
প্রথম পাতা / মতামত / হাজিরায় ব্যস্ত আছি (মানীর মেয়ের কাছে খোলা চিঠি)

হাজিরায় ব্যস্ত আছি (মানীর মেয়ের কাছে খোলা চিঠি)

মিকরাক ম্রং সোহেল : সূর্যদয়ের প্রাক্কালে স্নিগ্ধ প্রভাতে বিশুদ্ধ বাতাস ও শান্ত চারপাশ নিয়ে রচিত অনুকূল পরিবেশের মধ্যে যে স্বপ্ন দেখে ঘুম থেকে জেগে উঠি, বেলা বাড়ার সাথে সাথে সেই স্বপ্ন তপ্ত রোদের যন্ত্রণায় ও অশান্ত পরিবেশের চাপে পড়লেও তা মনে জিইয়ে রাখতে পারি। আলো-আধারির সন্ধিক্ষণে দিনের শাসনক্ষমতা যখন সাঙ্গ হওয়ার উপক্রম, অন্ধকার আসবে জেনেও অরুণ উদয়ে উত্থিত স্বপন মনে ধরে রাখতে পারি। ধীরে ধীরে পিছাতে গিয়ে দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার পর পিঠের চাপেই দেয়ালও যখন ভেঙে যায়, তখনও স্বপ্ন নিয়ে বাঁচতে পারি। এক বিন্দু জলের অভাবে অন্ত্র যখন শুকিয়ে হাহাকার, তখনও স্বপ্ন নিয়ে বাঁচতে পারি। স্বপ্ন তোমার-আমার সুখ-দুঃখের ছোট্ট সংসার, পাহাড়ের এক কোণে, শতাংশের এক জায়গায়, বোরাং তুলে, যেন একসাথে শ্বাস নিতে পারি, পাহাড়ের সাথে হাসতে-কাঁদতে-বলতে পারি। এর চেয়ে একচুলও বেশি নয়। পাহাড় কেটে বাহারি গাছের বাগান করব- এই স্বপ্ন নেই। পাহাড় কাটলে আমারই গলা কেউ কর্তন করছে- এই অনুভূতি হয়। পাহাড় পুড়িয়ে ফাইভ স্টার হোটেল বানাব- সেই স্বপ্নও নেই। পাহাড় পুড়ালে আমার পুরো দেহ কেউ পুড়িয়ে দিচ্ছে- এই অনুভূতি হয়। পাহাড়ের জঙ্গল পরিষ্কার করে অত্যাধুনিক ইকোপার্ক নির্মাণ করব- এই স্বপ্নও নেই আমার। জঙ্গল সাফ করলে পশু-পাখি-কীট-পতঙ্গ সব বিলীন হয়ে যায়। তখন মনে হয়, আমার-তোমার কোন প্রতিবেশী নেই। কার শব্দ আর গান শুনে আমাদের ঘুম ভাঙবে, দিন কাটবে আর সন্ধ্যা নামবে? পাহাড়ের সবাই চলে গেলে আমার শরীর থেকে আত্মা অন্য কোথাও চলে যায়- এই অনুভূতি হয়। আমার যদি পাহাড়ের প্রকৃতি ধ্বংস করে বাগান, হোটেল বা ইকোপার্ক বানিয়ে ধনবান হওয়ার স্বপ্নই থাকত, তাহলে আমি ব্রিটিশদের আগমনের আগে কিংবা আগমনের পরেও বন আইন হওয়ার পূর্বে হতে পারতাম। পাহাড়ের সাথে তো আমার হাজার বছরের মিতালি। বন আইনের পরও সেই বন্ধন অটুট। চাইলে আমি সব পারতাম- পাহাড় পুড়ানো, কর্তন কিংবা পরিষ্কার। তুমি আমায় তা করতে দেখেছ? করলে অন্যের ভাগে পুড়ানোর কিছু থাকত নাকি কাটার মতো কোন গাছ থাকত কিংবা বিচরণের কোন সুযোগ? আমার এত বড় স্বপ্ন নেই। স্বপ্ন একটাই- পাহাড়ের কোলে একমুঠো মাটি, যে মাটিতে বোরাং তুলে তোমাকে আনতে পারি এবং সেই বোরাং এ পা দুলিয়ে বসে তুমি আর আমি আকাশের দিকে তাকিয়ে সৃষ্টিকর্তার প্রতি সৃষ্টি সুখের উল্লাস করতে পারি। কিন্তু তা আর হচ্ছে কই! স্বপ্ন দেখার জন্য যে সময়ের প্রয়োজন, সেই সময় যে যাচ্ছে আদালতে হাজিরায়! আমি যে বন মামলা খেয়েছি!

নির্দিষ্ট বিশাল এলাকা নিয়ে গঠিত হয় আ.খিং। দায়িত্ব পড়ে নকমার উপর। সে মালিক নয়, তার কাজ শুধু দেখাশোনা। এলাকার সবাই নিজেদের প্রয়োজনমতো জায়গা নিয়ে চাষাবাদ করে জীবন ধারণ করতে পারে। এখানে কেউ ধনী হবে, কেউ দরিদ্র হবে কিংবা কেউ পাঁচবেলা খেয়ে থাকবে আর কেউ অভুক্ত থাকবে এর সুযোগ নেই। আ.খিংকে ঘিরেই জীবন আবর্তিত। কী পাহাড়, কী নদী আর কী সমতল- সবই আ.খিংয়ের। কেউ প্রকৃতি আর পরিবেশের ক্ষতি পারে না। ত্রিশ এর আইন পাহাড়ের উপর আমার অধিকার ছু মেরে নিয়ে গেল! পঞ্চাশের আইন আমাকে বলেই দিল, কোন সম্প্রদায় বা গোষ্ঠীর নামে কোন এলাকার মালিকানা দেওয়া যাবে না, কোন গোষ্ঠীর জমি কোন ব্যক্তির নামেও রাখা যাবে না, যার যা দখলে সেই মালিক! পাহাড় আমার, আমি পাহাড়ের, আর শাসন কার! আ.খিংকে ঘিরে যে সমাজের জীবন আবর্তিত, সেই সমাজ কাকে ঘিরে আবর্তিত হবে! সেই সমাজই কি আর থাকবে! তারপরও ভেবেছি, যেভাবেই হোক বোরাং তো থাকবে, তুমি কোন কষ্ট পেলে অন্তত তোমার অশ্রু মুছে দেওয়ার জায়গা হবে। স্বপ্নে তখনও এতো আঘাত আসেনি। স্বপ্ন কোনদিন মরে নাকি!
ষাটে খতিয়ান বেরোল, এসএ খতিয়ান। পঞ্চাশের আইনের চূড়ান্ত প্রতিফলন! যার যা আছে, তার নামেই তা! পাহাড় হল বনভূমি, নদী হল সরকারের আর আ.খিং এর বিশাল জায়গার আশ্রয় হল খাস খতিয়ানে! পাহাড়ের সাথে আমার সম্পর্কের দূরত্ব বাড়া আরম্ভ হল। ভাগ্যে জুটলো যৎসামান্য! আ.খিং নেই, নকমা নেই, সমাজ নেই! থাকলো আখিংকে ঘিরে আবর্তিত সমাজের হাহাকার মানুষ! তারপরও ভেবেছি, বোরাং তো থাকবে, তোমার-আমার পা রাখার মাটি তো হবে! তুমি আর আমিতো থাকবো! স্বপ্ন তো থাকবে! স্বপ্নকে তো কোন খতিয়ানে আবদ্ধ করে রাখতে পারেনি!
একাত্তরে কেউ লড়াই করলো, কেউ জীবন খোয়ালো, কেউ অত্যাচারিত, কেউ আশ্রয় নিলো প্রতিবেশী দেশে। বাহাত্তরে এসে দেখি, আমাদের যা ছিল, তাও নেই! সব বেদখল! স্থাবর হোক বা অস্থাবর! যুদ্ধ করে দেশকে স্বাধীন করে ফিরে এসে দেখি, আমার ভূমিতে আরেকজনের ঘর! পরিবারকে নিয়ে প্রতিবেশী দেশ থেকে ফেরত এসে দেখি, আমার ভূমিতে আরেকজনের ফসল! আমার গোয়াল ঘর গরুশূণ্য! হাড়ি-পাতিলও লুটপাট! কিছুই নেই! তারপরও স্বপ্ন দেখেছি, পাহাড়ের এক চিলতে মাটি পেলে বোরাং তুলে তোমাকে আনব! এই দেশ আমার, এই মাটি আমার, এই দেশ ও মাটি ছেড়ে আমি কোথাও যাব না! এই দেশেই তোমাকে নিয়ে আমি বোরাং বাধবো! এই দেশেই তোমার চোখের জল গাল বেয়ে মাটিতে পড়ার আগেই আমি ধরে ফেলব আর দুঃখ ঘোচাব!
আশিতে আবার জরিপ হলো, দশ এ খতিয়ান আসলো। জমির জায়গায় জমি আছে, সেই জমিতো আমিও ঠিকঠাক মতো আছি। শুধু খতিয়ানে আমার নামটাই নেই! সেখানে জন্ম নিয়েছে অন্য জনের নাম! বলো, আর যাই কোথায়! আর কি স্বপ্ন দেখা যায়? এরপরও স্বপ্ন দেখতে চাওয়া দুঃসাহসের কাজ। সবাই যা করতে পারে না, তা করাই নাকি চ্যাম্পিয়নের কাজ। সবাই যা করতে পারে না, তা করে দেখিয়েই নাকি মানুষ চ্যাম্পিয়ন হয়। আমিও চ্যাম্পিয়ন হতে চাই, তোমার চ্যাম্পিয়ন। স্বপ্ন দেখার চ্যাম্পিয়ন। স্বপ্ন দেখিয়ে দেওয়ার চ্যাম্পিয়ন।
সেই স্বপ্ন দেখার জন্যও তো সময় লাগবে! তা আর আছে কই! তোমার আর আমার বোরাং তোলা হলো কই! আমি যে এখন আদালতে হাজিরা দিতে ব্যস্ত! আমি যে বন মামলা খেয়েছি! একমুঠো মাটির উপর বোরাং তোলার স্বপ্ন দেখেছি, এই স্বপ্ন দেখার অপরাধেই বন মামলা!
ভালো থেকো!

– লেখক: সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট

Facebook Comments
Print Friendly, PDF & Email

এক নজরে

গারোরা কি একাধিক বিয়ে করতে পারে?

মিকরাক ম্রং সোহেল : মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১ এর ৬ ধারা অনুযায়ী, কোন বিয়ে বলবৎ …

error: Content is protected !!