শিরোনাম
প্রথম পাতা / মতামত / ক্রয়কৃত সম্পত্তি কে পাবে? ছেলে নাকি মেয়ে?

ক্রয়কৃত সম্পত্তি কে পাবে? ছেলে নাকি মেয়ে?

মিকরাক ম্রং সোহেল : এটি স্বীকৃত যে, মাতৃসম্পত্তি বা বংশপরম্পরার সম্পত্তির প্রকৃত উত্তরাধিকার শুধু মেয়েদের হাতেই। এর বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু ইদানিংকালের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল- নিজের পরিশ্রমে অর্জিত সম্পত্তির উত্তরাধিকারী কি শুধু মেয়েই হবে নাকি ছেলেও দাবি করতে পারে। এই প্রশ্নের উত্তর খুবই আকাঙ্ক্ষিত হয়ে উঠে কেউ নিচের এই উদাহরণে পড়লে। দম্পতির এক ছেলে আছে, কোন মেয়ে নেই। দম্পতির কোন একজন অথবা দুজন মিলে নিজের পরিশ্রমে নিজের টাকায় কোন জমি কিনেছে। এই দম্পতি মারা গেলে সেই ক্রয়কৃত সম্পত্তি কে পাবে? দম্পতির ছেলে পাবে নাকি স্ত্রীর বোন বা স্ত্রীর বোনের মেয়েরা পাবে? নিজের ক্রয়কৃত সম্পত্তি নিজের সন্তান না পেয়ে অন্য কেউ পেলে নিজের সন্তান অসহায় হয়ে যায়। সে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে বা ঘরই বাঁধবে কোথায়? তা একদিকে যেমন অযৌক্তিক, অন্যদিকে অমানবিকও মনে হয়। পায়ের নিচে থেকে মাটি সরে যাওয়ার মতো অবস্থা হয় ছেলে সন্তানের।

অর্জিত সম্পত্তি শুধু পরিবারের ছেলেমেয়ে সমানভাবে উত্তরাধিকারী হবে আর মেয়ে না থাকলে শুধু ছেলেই ওয়ারিশ পাবে- এই ধারণায় কী হতে পারে দেখা যাক। ধরি, এই মতে মিল রেখে আমরা আগালাম। এক সময় দেখা যাবে, আমাদের আর মাতৃসম্পত্তি নেই, সবগুলোই স্বোপার্জিত সম্পত্তি। তখন ‘গারোদের মধ্যে মেয়েরা উত্তরাধিকারী হয়’- অনন্য এই বাক্যটি অপ্রচলিত, অনাকাঙ্ক্ষিত আর মুছে যাওয়া ইতিহাস হয়ে যাবে। তখন জাতির জন্য বিষয়টি কি খুব গৌরবের হবে?
দুইটি কারণে গারো জাতি শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বের কাছেও ইতিবাচকভাবে পরিচিত। এক, গারো সন্তান মায়ের পরিচয়ে পরিচিত হয় এবং দুই, সম্পত্তিতে শুধু মেয়েরাই উত্তরাধিকারী হয়। বিষয়টি এমন হয়ে গেছে যে, এই দুইটি কারণই আমাদের জাতির ভিত্তি। এই দুইটি কারণই গারো জাতির স্তম্ভ। এই দুইটি কারণই গারো জাতির সত্তা নির্ধারণ করে দিয়েছে। এই দুইটি কারণেই বিশ্বের বিভিন্ন জাতিসত্তা থেকে বৈশিষ্ট্যগতভাবে আমরা আলাদা। এই দুইটি কারণের কারণেই আমাদের গারো পরিচয়। এই দুইটি কারণেই আমরা গারো। এই দুইটি কারণের মধ্যে কোন কারণ থেকে অথবা উভয় কারণ থেকেই যদি আমরা সরে আসি, তাহলে আমরা কি আর গারো থাকি? নাকি অন্য জাতিসত্তা থেকে আলাদা করার আর কিছু থাকে? এতে স্বকীয়তা নষ্ট হয়। জাতিত্ব থাকে না। গারোত্ব লোপ পায়।
বিষয়টি দাঁড়ায় এমন, ক্রয়কৃত সম্পত্তির অধিকার থেকে ছেলে সন্তানকে বঞ্চিত করলে তা অমানবিক হয়ে যায়, আবার দিলেও জাতিত্বের সত্তায় আঘাত লাগে। অর্থাৎ, মানবিক হতে গেলে জাতিত্ব প্রশ্নবিদ্ধ হয়, আর জাতিত্ব রাখতে গেলে অমানবিকতা দেখতে হয়। প্রথা নাকি মানবিকতা? এই দুইটাই যাতে বজায় থাকে এমন কোন উপায় কি আছে?
মাতৃসম্পত্তির উৎসগত কারণে মেয়েদের ওয়ারিশ হিসেবে যেমন অধিকার আছে, তেমনি চ্রাদেরও রয়েছে মতামতের ক্ষমতা ও দায়িত্ব। এই সম্পত্তিকে অন্যভাবে মাহারি সম্পত্তিও বলা হয়। এই সম্পত্তির মালিকানার পেছনে চ্রাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। আগেকার দিনে যুদ্ধের মাধ্যমে অথবা জঙ্গল পরিষ্কার করে বা জোরপূর্বক কোন এলাকার দখল নিতে হতো। এভাবে সেই এলাকার জমিতে একটি গোষ্ঠীর মালিকানা সৃষ্টি হতো। ঐ মালিকানা থাকতো একজনের নামে, আর নিয়ন্ত্রণ করতো নকমা। পর্যায়ক্রমে গোষ্ঠীর মালিকানা ভাগ হতে হতে ব্যক্তি পর্যায়ে চলে আসে। ব্যক্তির কাছে মালিকানা থাকলেও পূর্বেকার মতো চ্রাদের স্বীকৃত প্রভাব রয়ে গেছে। এখনও ওয়ারিশকে বঞ্চিত করে মাতৃসম্পত্তি হস্তান্তর করার সুযোগ নেই। তা করতে হলে ওয়ারিশের যেমন সম্মতি প্রয়োজন, তেমনি চ্রাদেরও মতামত আবশ্যক। চ্রাদের নিষেধ পরিবার মানতে বাধ্য। কিন্তু ক্রয়কৃত সম্পত্তি অর্জনের ক্ষেত্রে চ্রাদের বা মাহারির ভূমিকা থাকে না, সেক্ষেত্রে কেন এই সম্পত্তি মাহারির কাছে চলে যাবে? কেন এই সম্পত্তি হস্তান্তরের জন্য চ্রা বা মাহারির মতামত নিতে হবে?
মাতৃসম্পত্তি ঘরের মেয়ে ওয়ারিশ হিসেবে পাবে। মেয়ে না থাকলেও ছেলের ওয়ারিশ পাওয়ার সুযোগ নেই। এই সম্পত্তি ছেলেকে বা অন্য কাউকে বিক্রয় বা দান বা উইল করতে হলে ঘরের মেয়ের সম্মতি থাকতে হবে। এছাড়া মাহারিরও অনাপত্তি লাগবে। সেটা মৌন হোক বা সক্রিয়। এর মূলনীতিই হল এই সম্পত্তি একটি নির্দিষ্ট মাচং এর এবং এর বাইরে যেতে পারবে না, যেতে হলে মাহারির অনুমতি লাগবে।
ক্রয়কৃত সম্পত্তির ক্ষেত্রেও ওয়ারিশ বা উত্তরাধিকারী মেয়েই হবে। স্বোপার্জিত বা মাতৃসম্পত্তি যাই হোক, ছেলে সন্তানের উত্তরাধিকারী হওয়ার নজির নেই। তবে নিজের ক্রয়কৃত সম্পত্তি কোন ব্যক্তি যেকোনভাবে ছেলেকে দিতে পারে। দানও করতে পারে। উইলের মাধ্যমেই দিতে পারে। এতে কারও সম্মতি বা অনুমতির দরকার নেই। এই সম্পত্তিতে মাহারি বা চ্রাদের কোন দাবি বা মতামতও দেওয়ার সুযোগ নেই। এই সম্পত্তি অর্জনের ক্ষেত্রে তাদের অবদান নেই।
অর্থাৎ, কোন দম্পতি জীবদ্দশায় তাদের ক্রয়কৃত সম্পত্তি শুধু ছেলের জন্য বা ছেলেমেয়ে উভয়ের জন্য ভাগ করে দিতে পারে। মেয়ে না থাকলে শুধু ছেলেকেই তারা দিয়ে যেতে পারে। পরবর্তীতে স্ত্রীর বোন বা তার মেয়েদের এখানে দাবি করার কোন অধিকার নেই। কিন্তু, জীবিত থাকাবস্থায় কোন ব্যবস্থা করে না গেলে সমস্যা হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
বিদ্যমান প্রথাগত আইনে এর চেয়ে যুক্তিযুক্ত সমাধান আমার কাছে নেই।

– লেখক: সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট

Facebook Comments
Print Friendly, PDF & Email

এক নজরে

গারোরা কি একাধিক বিয়ে করতে পারে?

মিকরাক ম্রং সোহেল : মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১ এর ৬ ধারা অনুযায়ী, কোন বিয়ে বলবৎ …

error: Content is protected !!