শিরোনাম
প্রথম পাতা / মতামত / পাহাড় থেকে আদালত # ৮

পাহাড় থেকে আদালত # ৮

মিকরাক ম্রং সোহেল : বাসে বসে আছি। অনন্যা ক্লাসিক বাস। পাশে খালাত ছোট ভাই। গন্তব্য কিশোরগঞ্জ। জীবনের অন্যতম একটি অধ্যায় শুরু করতে যাচ্ছি। বিচার বিভাগে বিচারক হিসেবে যোগ দিবো। যে জীবন এক সময় পাহাড়ে পরে ছিল, এক পাহাড় থেকে আরেক পাহাড়ে, শুধু পাহাড়ের সাথে কথা বলার জন্য অথবা পাখিদের বাসা খোঁজার জন্য বা কোন শিকারের জন্য, সেই জীবন কাটবে এখন আদালতে! প্রকৃতির জীবন থেকে প্রকৃতির বিরুদ্ধে গমণকারীদের বিচারের জীবনে! ভাবতেই কেমন জানি মনে কম্পন অনুভূত হয়। হারিয়ে যাই আমি। পাহাড় থেকে পাহাড়ে। এক ঘটনা থেকে আরেক ঘটনায়। এক স্মৃতি থেকে আরেক স্মৃতিতে।

তখন মাত্র সন্ধ্যা। পাহাড়ের কূল ঘেষে হাটছি। সাথে আরও ত্রিশ থেকে চল্লিশ জন। এক জনের পর আরেকজন করে, পাশাপাশি নয়। আমি সম্ভবত মাঝখানে। পাখিদের কিচির-মিচির শব্দ চলছে বাঁশঝাঁড়গুলোতে। এই সময় রাতে ঘুমাবার জায়গা নিয়ে তাদের মধ্যে ঝগড়া বাধে। এই ঝগড়াই আশেপাশে এক ধরনের শব্দ পাঠায়, যা স্বাভাবিক, প্রাকৃতিক ও আবশ্যিক। মনে হয়, তাদের এই চেচামেচি না শুনলে রাত তার অন্ধকার নিয়ে আসতে পারে না। পক্ষীকূল সম্ভবত রাতকেই যেন এভাবে আহবান করে। পাশাপাশি জোনাকি আলো জ্বলতে শুরু করেছে। আর ঝোপঝাড়ের বিভিন্ন কীট-পতঙ্গের আওয়াজ তো আছেই। এই সময় দেখা গেল, একটু দূরে একটি ঘর। সেই ঘরের হ্যারিকেন বা দোয়াত থেকে মিটমিট আলো আসছে। সাথে এক গানের শব্দ শুনলাম। আট-দশ বছরের এক ছেলে গাইছে, ‘ভালো আছি, ভালো থেকো, আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখো’। অবাক ব্যাপার! এই গানতো আমাদের এখানে গায়, এখানে কিভাবে আসলো! ভাবতে লাগলাম। আমরা ত্রিশ-চল্লিশ জন হাটছি আর আমি ভাবছি গানের কথা। সকালে বের হয়ে এক পাহাড় থেকে আরেক পাহাড়ে চষে বেরিয়েছি শিকার করতে। শরীরের উপর গিয়ে গেছে ধকল। পানি নেই, খাওয়া নেই। এখন ফিরছি সফল শিকারের পর। জীবনের প্রথম শিকার। অন্যতম এক মুহূর্ত। কিন্তু তা ছাপিয়ে মাথায় জায়গা করে নিয়েছে, ‘আমাদের গ্রামের গান কিভাবে আরেক গ্রামে যায়’! জীবনের নানা ঘটনা আর স্মৃতির মধ্যে কেন এই সামান্য দুই লাইনের গান মগজে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছে তা অজানা।
নভেম্বর মাস হলেও বাসে গরম। গায়ে হাফহাতা শার্ট আর চোখে চশমা। চাকরিতে প্রবেশের আগে মেডিকেল টেস্ট করাতে হয়। টেস্ট করানোর সময় চিকিৎসক বলেছে, বাম চোখে আমি সামান্য কম দেখি, এই কারণে চশমা দিয়েছে। যদিও স্বাচ্ছ্যন্দবোধ করি না, তবুও চেষ্টা করি। একবার পড়ি, আবার কিছুক্ষণ পর খুলি। এরই মধ্যে আবার মিলিয়ে যাই পাহাড়ে। ঐদিকে আমাদেরকে নিয়ে বাস চলতে থাকে। আমার শরীর থাকে বাসে, মন চলে যায় অতীতের পাহাড়ে। এই সময় মাথায় আদালত নেই। নেই চেয়ারে বসে বিচারের স্বপ্ন। ভাসে শুধু, এ পর্যন্ত আসতে আমাকে কতটা পথ পাড়ি দিতে হয়েছে আর সেই পথে আমি কী চিহ্ন রেখে এসেছি! সেই চিহ্নগুলো কি সম্মুখভাগ্যের ভবিষ্যতবাণী নাকি স্রেফ সবকিছুর মতো স্বাভাবিক!
বাস দুলছে। আমি আছি পাহাড়েই। হয়তো পাখির খোঁজে। নয়তো শুধু অদেখা কিছু দেখার ইচ্ছায়। যে জীবন ফেলে এসেছি! যে জীবনে আর ফিরতে পারবো না! যে জীবন আমাকে বর্তমানে নিয়ে এসেছে। আছি সেই জীবনেই। বাস চলছে, চলুক! আমি আপাতত পাহাড়েই থাকি!

– লেখক: সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট

Facebook Comments
Print Friendly, PDF & Email

এক নজরে

গারোরা কি একাধিক বিয়ে করতে পারে?

মিকরাক ম্রং সোহেল : মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১ এর ৬ ধারা অনুযায়ী, কোন বিয়ে বলবৎ …

error: Content is protected !!