শিরোনাম
প্রথম পাতা / জেলা ভিক্তিক সংবাদ / পার্বত্য চট্টগ্রাম / ২০২০ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামের মানবাধিকার পরিস্থিতির উপর বার্ষিক প্রতিবেদন

২০২০ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামের মানবাধিকার পরিস্থিতির উপর বার্ষিক প্রতিবেদন

আচিক নিউজ ডেস্ক : পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি যথাযথ ও পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত না হওয়ায় ২০২০ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামের মানবাধিকার পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় অবতীর্ণ হয়েছে। পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে ১৯৯৭ সালে যে প্রত্যাশা সৃষ্টি হয়েছে, ২৩ বছরেও চুক্তি বাস্তবায়িত না হওয়ায় তা হতাশা ও ক্ষোভে পরিণত হয়েছে এবং ঔপনিবেশিক কায়দায় জুম্ম জনগণ শাসিত, শোষিত, বঞ্চিত ও নিপীড়িত হচ্ছে বলে ২০২০ সালে পার্বত্য চুক্তির ২৩তম বর্ষপূর্তির বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বলেছেন দেশের নাগরিক সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা।

২০২০ সালে সেনাবাহিনী, বিজিবি ও পুলিশ কর্তৃক ১৩৯টি মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা সংঘটিত করেছে। এসব ঘটনায় ৩ জনকে বিচার-বিহির্ভুত হত্যা, ৫০ জনকে অবৈধ গ্রেফতার ও ৪৯ জনকে সাময়িক আটক, ৫৪ জনকে মারধর ও হয়রানি এবং তার মধ্যে ৭ জনকে গুরুতর আহত, ১০৪টি বাড়ি তল্লাসী ও ২০টি অস্থায়ী দোকানসহ ২৫টি বাড়ি ভাঙচুর, ত্রাস সৃষ্টির লক্ষ্যে বিভিন্ন এলাকায় ৩ বার ব্লাঙ্ক ফায়ার করেছে। কোভিড-১৯ মহামারীর চরম দুর্যোগ ও সংকটের মধ্যেও পার্বত্য চট্টগ্রামে থেমে ছিল না সেনাবাহিনী, বিজিবি ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর দমন-পীড়ন ও সামরিক অভিযান এবং রাষ্ট্রীয় ও অরাষ্ট্রীয় পক্ষ কর্তৃক জুম্মদের জায়গা-জমি বেধখল ও তাদেরকে স্বভূমি উচ্ছেদ। সেনাবাহিনী, প্রশাসন ও শাসকমহলের মদদে ২০২০ ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদ’ নামে উগ্র সাম্প্রদায়িক ও উগ্র জাতীয়তবাদী সংগঠনের নেতৃত্বে মুসলিম সেটেলার কর্তৃক সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ছড়ানো হয়েছে। মৌলবাদী ও জুম্ম বিদ্বেষী কিছু ইসলামী গোষ্ঠী কর্তৃক সুপরিকল্পিতভাবে জুম্মদেরকে ইসলামে ধর্মান্তরিত করার কার্যক্রম জোরদার হয়েছে।

২০২০ সালে একজন সেনা সদস্যসহ সেটেলার বাঙালি কর্তৃক ১৬ জন জুম্ম নারী ও শিশু সংহিংসতার শিকার হয়। জুম্মদের মালিকানাধীন ভূমি জবরদখল ও ভূমি বিরোধকে কেন্দ্র করে ২০২০ সালে সেটেলার বাঙালি, ভূমিদস্যু, রোহিঙ্গা ও নিরাপত্তা বাহিনী কর্তৃক ৪৭টি ঘটনা সংঘটিত করা হয়েছে। এসব ঘটনায় ১৭ জন জুম্ম আহত হয়েছে, ৩টি সাম্প্রদায়িক হামলা সংঘটিত হয়েছে, ভূমি জবরদখলের ফলে ৮৩৯ পরিবার ক্ষতির মুখে পড়েছে, ৩,০৩৬ একর জায়গা বেদখল করা হয়েছে।

২০২০ সালে সংস্কারপন্থী ও ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে সেনাবাহিনী কর্তৃক তিন জেলার বিভিন্ন স্থানে সশস্ত্রভাবে মোতায়েন রেখে সন্ত্রাস চালানো হয়েছে। সেনা-সমর্থিত এসব সশস্ত্র গোষ্ঠী কর্তৃক ২০২০ সালে ১০০টি মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা সংঘটিত করা হয়েছে। এসব ঘটনায় ২১ জনকে হত্যা করা হয়েছে, ৫০ জনকে অপহরণ করা হয়েছে, ১৭ জনকে মারধর ও হয়রানি করা হয়েছে, ৮ জনকে হত্যার হুমকি প্রদান হয়েছে, জনসংহতি সমিতির ৮২ জন সদস্য ও সমর্থকদের বিরুদ্ধে সাজানো মামলা দায়ের করা হয়েছে। এছাড়া মগ পার্টি কর্তৃক ১২টি বাড়ি জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে।

পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন ও সরকারের চুুক্তি বিরোধী তৎপরতা:

২০২০ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির অবাস্তবায়িত বিষয়সমূহে বাস্তবায়নে সরকারের পক্ষ কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি। এমনকি পার্বত্য চুক্তির অধীনে গঠিত চুক্তি বাস্তবায়ন কমিটি, পার্বত্য ভূমি কমিশন, টাস্ক ফোর্স ইত্যাদি কোন কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়নি। গত ৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০ সালে বান্দরবানে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি কমিশনের সভা আহ্বান করা হলেও কোরাম সংকটের কারণে আনুষ্ঠানিক মিটিং অনুষ্ঠিত হতে পারেনি। তবে বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের কার্যালয়ে ভূমি কমিশনের নতুন অফিস উদ্বোধন করা হয়েছে। এসময় প্রশাসন ও সেনাবাহিনীর ইন্ধনে সেটেলার বাঙালি মুসলিমরা ভূমি কমিশনের চেয়ারম্যান-সদস্যদের ঘেরাও করে। বস্তুত ২০২০ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির অবাস্তবায়িত বিষয়সমূহ বাস্তবায়নে সরকারের কোন উদ্যোগ ছিল না বললেই চলে।

বিশ্বব্যাপী কোভিড-১৯ মহামারীর কারণে দেশব্যাপী সাধারণ ছুটি ও লকডাউনের ফলে ২০২০ সালের সরকারের কার্যক্রমে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের বিষয়টিও একেবারেই ধামাচাপা পড়েছিল। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার রাজনৈতিক ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে সমাধানের লক্ষ্যে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির মধ্যে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর ঐতিহাসিক পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরের পর বিগত ২৩ বছরে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির কিছু ধারা-উপধারা বাস্তবায়িত হলেও এখনো দুই-তৃতীয়াংশ ধারা অবাস্তবায়িত অবস্থায় রয়েছে। বিশেষ করে চুক্তির মৌলিক বিষয়সমূহ হয় সম্পূর্ণ অবাস্তবায়িত অবস্থায় রয়েছে নতুবা ত্রুটিপূর্ণভাবে আংশিক বাস্তবায়িত করা হয়েছে।

পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের মাধ্যমে পার্বত্য সমস্যার রাজনৈতিক ও শান্তিপূর্ণ সমাধানের পরিবর্তে সরকার পূর্ববর্তী শাসকদের মতো দমন-পীড়নের মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নিয়েছে। ফলে বিগত ২৩ বছরেও পার্বত্য সমস্যার কাক্সিক্ষত সমাধান হওয়া তো দূরের কথা, সমস্যা আরও জটিল থেকে জটিলতর হয়ে উঠেছে। বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রামের সার্বিক পরিস্থিতি অনেকটা চুক্তি-পূর্ব অবস্থায় পদার্পণ করেছে। পূর্বের সরকারগুলোর মতো বর্তমান সরকারও একদিকে ইসলামীকরণ নীতি বাস্তবায়ন করে চলেছে এবং অপরদিকে জুম্ম জনগণের জাতীয় পরিচিতি একেবারে বিলুপ্ত করার জন্য পার্বত্য চট্টগ্রাম সামরিকায়ন জোরদার করেছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের সাধারণ প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা, উন্নয়নসহ সকল বিষয় স্থানীয় সেনা ও গোয়েন্দাবাহিনীর হাতে তুলে দেয়া হয়েছে। পার্বত্য চুক্তির অব্যবহিত পরে প্রত্যাহৃত ক্যাম্পসমূহ পুনস্থাপনের জন্য সেনাবাহিনী ২০২০ সালে ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। ২০২০ সালে ৭টি নতুন ক্যাম্পসহ বিগত কয়েক বছরে অনেক ক্যাম্প পুনস্থাপন করা হয়েছে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের পরিবর্তে সরকার চুক্তি বিরোধী ও জুম্ম স্বার্থ পরিপন্থী তৎপরতা বৃদ্ধি করেছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম অধ্যুষিত অঞ্চলের বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণের পরিবর্তে পার্বত্য চট্টগ্রামকে মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলে পরিণত করার ষড়যন্ত্র জোরদার করা হয়েছে। জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত পূর্ণাঙ্গ পার্বত্য জেলা পরিষদ গঠনের পরিবর্তে ডিসেম্বরে দলীয় সদস্যদের দিয়ে অন্তর্বর্তী পার্বত্য জেলা পরিষদ গঠন করা হয়েছে। তার মাধ্যমে অগণতান্ত্রিক ও দলীয়করণের ধারা আরো জোরদার করা হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়াকে বানচাল করার উদ্দেশ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির বিরুদ্ধে ২০০০ সালে জনৈক বদিউজ্জামান ও ২০০৭ সালে এ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম কর্তৃক পৃথক দু’টি মামলায় হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপীল বিভাগে চলমান মামলা মোকাবেলার ক্ষেত্রে ২০২০ সালেও সরকার উদ্দেশ্য-প্রণোদিতভাবে নির্লজ্জ নিলিপ্ততা প্রদর্শন করেছে। মার্চ মাসে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ ও পার্বত্য জেলা পরিষদসমূহকে পাশ কাটিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলার সীমান্ত সড়ক ও স্থলবন্দর নির্মাণ কাজ পরিদর্শন করেছেন যা ছিল পার্বত্য চুক্তির সরাসরি লঙ্ঘন। চুক্তি মোতাবেক অবশিষ্ট চার শতাধিক অস্থায়ী ক্যাম্প প্রত্যাহারের পরিবর্তে ডিসেম্বর মাসে খাগড়াছড়ি সফরকালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পার্বত্য চুক্তিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে চুক্তির পর প্রত্যাহৃত ক্যাম্পগুলো পুনরায় স্থাপনের ঘোষণা দিয়েছেন।

‘অপারেশন উত্তরণ’ নামক একপ্রকার সেনাশাসনসহ সকল অস্থায়ী ক্যাম্প প্রত্যাহার না করায় ২০২০ সালে সেনাবাহিনী কর্তৃক মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। রুমা জোনের অধীন বগালেক ক্যাম্প, চুংচংপাড়া ক্যাম্প, পুকুরপাড়া ক্যাম্প, বাকলাই ক্যাম্প, মুননোয়াম ক্যাম্প এবং রনিনপাড়া ক্যাম্পের আওতাধীন প্রায় অর্ধ-শত গ্রামের জুম্ম গ্রামবাসীরা প্রত্যেক বছরে দুইবার করে বিনামজুরীতে ক্যাম্পে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে। তাছাড়া প্রতি পরিবার থেকে বিনামূল্যে দশটি করে বাঁশও ক্যাম্পে দিতে হচ্ছে। রুমায় নতুন স্থাপিত একটি অস্থায়ী ক্যাম্পে প্রতিদিন তিনজন করে জুম্ম গ্রামবাসীকে ১,৫০০ ফুট নীচের ঝিরি থেকে সেনাবাহিনীর জন্য বিনামজুরীতে পানি তুলে দিতে হচ্ছে। বনজ সম্পদ পরিবহনের সময় ২০২০ সালে ছোট হরিনা ও বরকল বিজিবি জোন ও সুবলং সেনা ক্যাম্পসহ তিন পার্বত্য জেলার বিভিন্ন ক্যাম্পে কাঠ বোঝাই যানবাহন থেকে সেনাবাহিনী ও বিজিবি কর্তৃক ব্যাপক চাঁদাবাজির তথ্য পাওয়া গেছে।

অধিকারকামী জুম্মদেরকে ক্রিমিনালাইজেন:

আওয়ামীলীগ নেতৃত্বাধীন বর্তমান মহাজোট সরকার কেবল পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া বন্ধ রাখেনি, সেই সাথে একদিকে পার্বত্য চুক্তি বিরোধী ও জুম্ম স্বার্থ পরিপন্থী কার্যক্রম বাস্তবায়ন করে চলেছে, অন্যদিকে জনসংহতি সমিতির সদস্য ও সমর্থকসহ পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের দাবিতে আন্দোলনরত ব্যক্তিবর্গ ও সংগঠনগুলোকে ‘সন্ত্রাসী’, ‘চাঁদাবাজ’, ‘অস্ত্রধারী’ হিসেবে পরিচিহ্নিত করার ক্রিমিলাইজেশন জোরদার করেছে। ফলে আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার আদায়ের লক্ষ্যে আন্দোলনরত ব্যক্তিবর্গ ও সংগঠনের সদস্যদের বিরুদ্ধে একের পর এক সাজানো মামলা দায়ের, নির্বিচার গ্রেফতার, একটা মামলায় জামিন হলে সাথে সাথে আরেকটি সাজানো মামলায় জেল গেইট থেকে গ্রেফতার, গুম, তথাকথিত ‘ক্রসফায়ার’-এর নামে বিচার-বহির্ভূত হত্যা, ক্যাম্পে নিয়ে অমানুষিক নির্যাতন, সন্ত্রাসী খোঁজার নামে রাত-বিরাতে ঘরবাড়ি তল্লাসী বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রামে নিত্য-নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।

২০২০ সালে সেনাবাহিনী, বিজিবি ও পুলিশ কর্তৃক ১৩৯টি মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা সংঘটিত করেছে। এসব ঘটনায় ৩ জনকে বিচার-বিহির্ভুত হত্যা, ৫০ জনকে অবৈধ গ্রেফতার ও ৪৯ জনকে সাময়িক আটক, ৫৪ জনকে মারধর ও হয়রানি এবং তার মধ্যে ৭ জনকে গুরুতর আহত, ১০৪টি বাড়ি তল্লাসী ও ২০টি অস্থায়ী দোকানসহ ২৫টি বাড়ি ভাঙচুর, ত্রাস সৃষ্টির লক্ষ্যে বিভিন্ন এলাকায় ৩ বার ব্লাঙ্ক ফায়ার করেছে। সেনাবাহিনী ফেব্রুয়ারিতে রাঙ্গামাটি সদর উপজেলার বন্দুকভাঙা ইউনিয়নে অর্পণ চাকমা (৩১) এবং ডিসেম্বরে নান্যাচরের সাবেক্ষং ইউনিয়নে নয়ন চাকমা ও মগবান ইউনিয়নে উজ্জল চাকমা (৪৮) নামে তিনজন নিরস্ত্র ও নিরীহ ব্যক্তিকে ঠান্ডা মাথায় গুলি করে হত্যা করে। সেনাবাহিনী অবৈধভাবে গ্রেফতারের পর অনেক নিরীহ ব্যক্তিকে ৭/৮ দিন ধরে বিনাবিচারে ক্যাম্পে আটক করে রাখে এবং সেনা হেজাফতে অমানুষিকভাবে মারধর করা হয়। যেমন মে মাসে সুইচাপ্রু মারমাকে কাপ্তাই সেনা জোনে নিয়ে অবৈধভাবে ৭ দিন ধরে আটকে রেখে অমানুষিক মারধর করে। আগস্টে রাঙ্গামাটি সদর উপজেলার জীবতলী ইউনিয়নে বীরজিৎ চাকমা (২৬) নামে নিরীহ এক জুম্ম কাঠমিস্ত্রিকে ৮ দিন পর্যন্ত গবঘোনা সেনা ক্যাম্পে আটকে রেখে নির্যাতন করে।

আটকের পর অনেক নিরীহ ব্যক্তিকে উদ্দেশ্য-প্রণোদিতভাবে অস্ত্র গুঁজে দিয়ে সন্ত্রাসী সাজিয়ে সেনাবাহিনী ও পুলিশ জেলে প্রেরণ করে থাকে। পদোন্নতি লাভের উদ্দেশ্যে এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে অস্ত্র ও অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীর উপস্থিতি দেখিয়ে জনমতকে বিভ্রান্ত করার লক্ষ্যে সেনাবাহিনী ও বিজিবি নিজেরাই অস্ত্র রেখে দিয়ে নিজেরাই সেগুলো উদ্ধার করার ষড়যন্ত্র করে থাকে। যেমন সেপ্টেম্বরে বিজিবি নাইক্ষ্যংছড়িতে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র উদ্ধারের নাটক মঞ্চস্থ করেছে। অনুরূপভাবে নভেম্বর মাসে সেনাবাহিনী কর্তৃক বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেকে এবং বিজিবি কর্তৃক রুমা উপজেলায় অস্ত্র উদ্ধারের নাটক করা হয়। নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা বিভিন্ন জায়গায় ধর্মীয় স্বাধীনতার উপরও হস্তক্ষেপ করে চলেছে। যেমন মে মাসে মাটিরাঙ্গা উপজেলায় বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী স্থানীয় জুম্ম গ্রামবাসী কর্তৃক একটি বৌদ্ধ বিহার নির্মাণ করার সময় রামগড় উপজেলার রামগড় লাচারিপাড়া বিজিবি ক্যাম্পের বিজিবি সদস্যরা বাধা দেয়। সেনাবাহিনীর উন্নয়ন কার্যক্রমের ফলে ১৭২টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

অপপ্রচার, মতপ্রকাশ ও সভা-সমিতির স্বাধীনতার উপর বিধি-নিষেধ:

২০২০ সালে সারাদেশে মানুষের নাগরিক অধিকার অবদমনের ধারা জোরদার হয়েছে। বিশেষ করে করোনা মহামারীর সুযোগে সরকারের এই নজীরবিহীন অবদমন চালিয়ে যাচ্ছে। করোনাকালে সরকারি কোনো তৎপরতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে অবৈধভাবে গ্রেফতার করা হচ্ছে। এভাবে বাংলাদেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ব্যাপকভাবে সংকুচিত করা হয়েছে। ভিন্নমতকে সাংঘাতিকভাবে রুদ্ধ করা হচ্ছে।

২০২০ সালে একদিকে ভাড়াটে হলুদ সাংবাদিকদের মাধ্যমে জনসংহতি সমিতি তথা জুম্ম জনগণ ও পার্বত্য চট্টগ্রাম সম্পর্কে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে, অন্যদিকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সভা-সমিতির স্বাধীনতা, মানবাধিকার লঙ্ঘনের সংবাদ প্রকাশের উপর বিধি-নিষেধ আরোপের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামকে কার্যত অবরুদ্ধ অঞ্চলে পরিণত করা হয়েছে। যেমন এপ্রিল মাসে হিল ভয়েস নামে পার্বত্য চট্টগ্রাম, আদিবাসী ও সংখ্যালঘু বিষয়ক একটি নিউজপোর্টাল বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এ রকম অনেক নিউজপোর্টাল দেশে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। ফলে ২০২০ সালে সামরিক ও আধা-সামরিক বাহিনীর নিপীড়ন-নির্যাতনের খবর সম্পূর্ণভাবে দেশের সংবাদ মাধ্যম ও দেশবাসীর অন্তরালে থেকে যায়।

২০২০ সালে সেনাবাহিনী হয়রানির উদ্দেশ্যে তিন পার্বত্য জেলায় গ্রামে গ্রামে জুম্ম গ্রামবাসীদের পারিবারিক তথ্য সংগ্রহ করেছে। যেমন কোভিড-১৯ মহামারীর কারণে সৃষ্ট লকডাউনের ফলে জনজীবনে দুর্ভোগ ও অচলাবস্থার মধ্যেও মে মাসে রোয়াংছড়ির গ্রামে গ্রামে সেনাবাহিনী কর্তৃক জুম্মদের হয়রানি এবং তাদের কাছ থেকে অবান্তর তথ্যসংগ্রহ করেছে। নভেম্বর মাস থেকে আজ অবধি বিলাইছড়ি উপজেলার ফারুয়া ইউনিয়ন এলাকায় গ্রামে গ্রামে সেনাবাহিনী জুম্মদের পরিবার থেকে হয়রানিমূলক তথ্য সংগ্রহ অভিযান চালাচ্ছে।

ভূমি বেদখল ও ভূমি থেকে উচ্ছেদ:

জুম্মদের রেকর্ডীয় ও ভোগদলীয় ভূমি জবরদখল ও ভূমি বিরোধকে কেন্দ্র করে ২০২০ সালে সেটেলার বাঙালি, ভূমিদস্যু, রোহিঙ্গা ও নিরাপত্তা বাহিনী কর্তৃক ৪৭টি ঘটনা সংঘটিত করা হয়েছে। এসব ঘটনায় ১৭ জন জুম্ম আহত হয়েছে, ৩টি সাম্প্রদায়িক হামলা সংঘটিত হয়েছে, ভূমি জবরদখলের ফলে ৮৩৯ পরিবার ক্ষতির মুখে পড়েছে, ৩,০৩৬ একর জায়গা বেদখল করা হয়েছে। যেমন ফেব্রুয়ারি মাসে নানিয়াচর উপজেলার বগাছড়ি ১৭ মাইল নামক এলাকায় ৭০-৮০ জন সেটেলার বাঙালি বেদখলের উদ্দেশ্যে আদিবাসী জুম্মদের জায়গায় ঘর তুলতে গেলে জুম্ম গ্রামবাসীরা বাধা প্রদান করলে সেটেলার বাঙালিরা উল্টো জুম্ম গ্রামবাসীদের উপর হামলা শুরু করে। মার্চ মাসে গুইমারা উপজেলার জালিয়াপাড়া এলাকায় বাঙালি সেটেলাররা জনৈক সেটেলার বাঙালি মোটর সাইকেল চালককে অপহরণের পর হত্যার অভিযোগ এনে আদিবাসী জুম্মদের উপর সাম্প্রদায়িক হামলা চালায়। এপ্রিল মাসে লংগদু উপজেলায় বাঙালি সেটেলারের সাম্প্রদায়িক হামলায় ৬ জন জুম্ম আহত হন। মার্চ মাসে মানিকছড়ি উপজেলার তিনটহুরি ইউনিয়নে পার্শ্ববর্তী গ্রামের একদল সেটেলার বাঙালি অংগ্য পাড়া সংলগ্ন এক বৌদ্ধ বিহার অগ্নিসংযোগ করে ভস্মীভূত করে।

উন্নয়নের নামে জুম্মদের স্বভূমি উচ্ছেদের প্রক্রিয়া ২০২০ সালে ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। জুলাই মাসে বিজিবি কর্তৃক অন্তত ২৩ জন জুম্ম মালিকানাধীন প্রায় ৩৩ একর এবং সেনাবাহিনী কর্তৃক একটি মাছের পুকুরসহ ১০ জন পাহাড়ির ভূমি দখলে নেয়া হয়েছে। সেপ্টেম্বর থেকে বান্দরবানের চিম্বুক পাহাড়ে নীলগিরিতে জুম্মদের জায়গার উপর সেনাবাহিনীর উদ্যোগে নির্মাণ হচ্ছে পাঁচ তারকা হোটেলসহ বিলাসবহুল পর্যটন কমপ্লেক্স। এই হোটেল নির্মাণের ফলে প্রত্যক্ষভাবে ম্রোদের চারটি পাড়া এবং পরোক্ষভাবে ৭০-১১৬টি পাড়া ক্ষতিগ্রস্ত হবে, প্রায় ১০,০০০ জুমচাষি উদ্বাস্তু হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে। ম্রোদের জুমভূমি ও মৌজা ভূমির উপর বিলাসবহুল পাঁচতারা হোটেল নির্মাণের পরিকল্পনা বাতিল করার জন্য স্থানীয় ম্রো জনগোষ্ঠীসহ দেশে-বিদেশে ব্যাপক দাবি উঠলেও সরকার এ বিষয়ে নিলিপ্ত ভূমিকা পালন করে চলেছে। অপরদিকে প্রবল জনবিরোধিতা সত্ত্বেও সেনাবাহিনী হোটেল নির্মাণের কাজ অব্যাহতভাবে চালিয়ে যাচ্ছে।

বান্দরবান জেলায় ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগ নেতা ও বহিরাগত ভূমিদস্যু কর্তৃক জুম্ম গ্রামবাসীদের উচ্ছেদ করে ভূমি জরদখলের লক্ষ্যে জুম্মদের ৫ হাজার রাবার গাছ পুড়িয়ে দেয়া, গ্রাম ছেড়ে চলে যাওয়া হুমকি প্রদানের ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। প্রায় সাড়ে ৫ হাজার একর সামাজিক মালিকানাধীন জুমভূমি দখলের পূর্বের ধারাবাহিক তৎপরতা করোনা সংকটকালে আরো জোরদার হয়েছে। নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা আওয়ামীলীগ সভাপতি ও উপজেলা চেয়ারম্যান মো: শফিউল্লাহ কর্তৃক পর্যটনের নামে প্রায় ১,০০০ একর জায়গা অবৈধ দখল করা হয়েছে।

লামা উপজেলায় অবৈধভাবে ৩,০০০ একর জমি বেদখল করেছে মেরিডিয়ান কোম্পানী। এপ্রিল মাসে লামা উপজেলায় মেরিডিয়ান কোম্পানির দায়েরকৃত সাজানো মামলায় জড়িত করে পুলিশ উপজেলার সরই ইউনিয়নের ঢেঁকিছড়া নোয়াপাড়ার কার্বারী লাংকুম ম্রো (৪৮) ও অপর এক বাসিন্দা রিং রং ম্রো (৫০) নামে দুইজন ম্রো গ্রামবাসীকে গ্রেফতার করে, যাতে করে মেরিডিয়ান কোম্পানী নির্বিঘ্নে ভূমি দখল করতে পারে।

জিকে শামীমের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বদৌলতে সিলভান ওয়াই রিসোর্ট ও স্পা লিমিটেডের তান্ডবে ইতোপূর্বে বান্দরবান সদর উপজেলার সাইঙ্গা মারমা পাড়া উচ্ছেদ হয়ে গেছে। এই কোম্পানী আদিবাসী গ্রামের অন্তত ২৫০ একর ভূমি বেদখল করে নিয়েছে। সাইঙ্গ্যা ত্রিপুরা পাড়া, লাইমি পাড়া ও হাতিভাঙ্গা পাড়ার প্রায় ১৭০ পরিবার আদিবাসী জুম্ম উচ্ছেদের হুমকিতে রয়েছে।
মে মাসে খাগড়াছড়ি ডেপুটি কমিশনের অফিসে এক সভার মাধ্যমে সেনাবাহিনী তাদের পর্যটন ব্যবসার স্বার্থে সাজেকের শিজকছড়ায় একটি বাঁধ নির্মাণের কাজ জোরদার করেছে। সেনাবাহিনী কর্তৃক বান্দরবানে হাজার হাজার একর জুমভূমি জবরদখল করে যেভাবে জুম্মদের উচ্ছেদ ও জীবনজীবিকার ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, সেভাবে সাজেকে বাঁধ নির্মাণের ফলেও প্রায় ২৫০ জুম্ম পরিবারের ৫০০ একর জায়গা ও বসতি এবং অত্রাঞ্চলের বনাঞ্চল ও জীব-বৈচিত্র্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।

পরিবেশ আইন অমান্য করে বান্দরবন জেলার লামা, আলিকদম, থানচি, নাক্ষ্যংছড়ি ও সদর উপজেলায় কমপক্ষে ৬০টি ইটভাটা স্থাপনের ফলে এলাকার প্রাকৃতিক পরিবেশ চরমভাবে দূষিত হচ্ছে এবং ইটভাটার আশেপাশের জমিগুলোর উর্বরতা কমে যাচ্ছে। ইট ভাটার ফলে পাশের সব গ্রামের পানির উৎসসমূহ নষ্ট করে ফেলার কারণে গ্রামবাসীরা মারাত্মক পানি সংকটে পড়েছে।
প্রশাসন ও ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর ছত্রছায়ায় একটি কায়েমি স্বার্থবাদী ব্যবসায়ী গোষ্ঠী কর্তৃক বান্দরবানের বিভিন্ন উপজেলায় অব্যাহতভাবে পাথর ও বালু উত্তোলন ও পাচারের ফলে এলাকার ঝিরি, ঝর্ণা ও প্রাকৃতিক জলাধার শুকিয়ে যাচ্ছে। এতে এলাকার মানুষের পানীয় ও ব্যবহার্য জলের সংকট যেমন দেখা দিচ্ছে, তেমনি জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে।
অনুরূপভাবে সেনাবাহিনীর উদ্যোগে নির্মাণাধীন সাজেক-কমলাক সংযোগ সড়ক এবং রাজস্থলী-থেগা (বরকল) সংযোগ সড়কও জুম্মদের শত শত পরিবারকে উচ্ছেদ ও ক্ষতিগ্রস্ত, বনাঞ্চল ও প্রাণ-বৈচিত্র্যকে ধ্বংস, সর্বোপরি অন্য জেলা হতে মুসলমানদের অনুপ্রবেশ ত্বরান্বিত করবে। এভাবেই ডেভেলাভমেন্ট ইঞ্জিনিয়ারিং-এর মাধ্যমে সেনাবাহিনী জুম্ম জনগণকে জাতিগতভাবে নির্মূলীকরণের নীলনকশা বাস্তবায়ন করে চলেছে।

নারীর উপর সহিংসতা:

২০২০ সালে একজন সেনা সদস্যসহ সেটেলার বাঙালি কর্তৃক ১৬ জন জুম্ম নারী ও শিশু সংহিংসতার শিকার হয়। তার মধ্যে আগস্ট মাসে লামায় বহিরাগত ৬ বাঙালি সেটেলার কর্তৃক এক বিধবা ত্রিপুরা নারীকে (২৫) গণধর্ষণ এবং সেপ্টেম্বর মাসে খাগড়াছড়ি সদর এলাকায় ব্যাপক নিরাপত্তা ও আইন-শৃঙ্খলার বাহিনীর নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যেও ৯ জন বাঙালি সেটেলার কর্তৃক মানসিক প্রতিবন্ধী এক জুম্ম নারীকে গণধর্ষণ এবং বাড়ির মূল্যবান জিনিসপত্র লুটপাটের ঘটনা ছিল সবচেয়ে লোমহর্ষক ও পৈশাসিক।

এপ্রিল মাসে রনিকা চাকমা (২২) নামে এক গর্ভবর্তী জুম্ম নারীকে জুরাছড়ি উপজেলা থেকে রাঙ্গামাটি জেলা সদর হাসপাতালে নেয়ার পথে তল্লাসীর নামে সুবলং ক্যাম্পের সেনাবাহিনী কর্তৃক বিনা কারণে প্রায় একঘন্টা আটকে রাখার ফলে হাসপাতালে পৌঁছার আগেই অর্ধেক পথে উক্ত গর্ভবতী নারীর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। জুলাই মাসে রোয়াংছড়ি উপজেলা সদরের অংগ্যপাড়া গ্রামে সেনাবাহিনী কর্তৃক সন্ত্রাসী ধরার নামে এলোপাতাড়ি গুলি বর্ষণের ফলে শান্তিলতা তঞ্চঙ্গ্যা (৩০) নামে এক জুম্ম নারী নিহত এবং তার ৫ বছরের সন্তান অর্জুন তঞ্চঙ্গ্যা সুকেন আহত হয়।

কোভিড-১৯ মহামারী সংকটে দমন-পীড়ন জোরদারকরণ:

২০২০ সালে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মতো পার্বত্য চট্টগ্রামেও ব্যাপক আঘাত হানে প্রাণঘাতি কোভিড-১৯ মহামারী। করোনাভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধে লকডাউনের ফলে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মতো পার্বত্য চট্টগ্রামেও দেখা দেয় একদিকে কর্মহীন হয়ে পড়া খেটে-খাওয়া মানুষের খাদ্য সংকট, অন্যদিকে করোনাভাইরাস সংক্রমণের আতঙ্ক। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কর্মজীবী জুম্ম যুবক-যুবতীরা এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি ও বান্দরবান জেলার স্ব স্ব ঘরবাড়িতে ফেরার সময় যানবাহনের চরম ভোগান্তি ছাড়াও চট্টগ্রাম জেলার সাথে তিন পার্বত্য জেলা সীমানায় তাদের পড়তে হয়েছে সেনাবাহিনী ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অবর্ণনীয় হয়রানি ও নির্যাতনে। এধরনের চরম দুর্যোগ ও সংকটের মধ্যেও পার্বত্য চট্টগ্রামে থেমে নেই সেনাবাহিনী, বিজিবি ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান এবং রাষ্ট্রীয় ও অরাষ্ট্রীয় পক্ষ কর্তৃক জুম্মদের জায়গা-জমি বেধখল ও তাদেরকে স্বভূমি উচ্ছেদ।

আগস্ট মাসে বাঘাইছড়ির ১২ বীর বাঘাইহাট সেনা জোন, বাঘাইহাট ৫৪ বিজিবি জোন এবং মারিশ্যা ২৭ জোন করোনা মহামারীর জন্য বরাদ্দকৃত ইউএনডিপি’র উক্ত চাল বিতরণ কর্মসূচি বন্ধ করে দেয়। আগস্ট মাসে পানছড়ি উপজেলার পানছড়ি বিজিবি জোনের সদস্য চেঙ্গী ইউনিয়নের তারাবন গীর্জা এলাকায় করোনা ভাইরাস প্রাদুর্ভাবের কারণে নির্মিত একটি অস্থায়ী বাজারে হানা দিয়ে জুম্ম সবজী বিক্রেতাদের ১৫-২০টি দোকান ভাঙচুর করে দেয়।

মৌলবাদী গোষ্ঠী কর্তৃক ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরকরণ ও সাম্প্রদায়িক তৎপরতা:

সেনাবাহিনী ও গোয়েন্দা বাহিনীর উদ্যোগে ২০১৯ সালের শেষে মুসলিম সেটেলার, উগ্র জাতীয়তাবাদী ও উগ্র সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর সকল সংগঠনগুলোর বিলুপ্ত করে ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদ’ নামে একক সংগঠন গঠন করে দেয়া হয় এবং এই সংগঠনের নেতৃত্বে সেটেলারদেরকে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বিরোধী তৎপরতা, ভূমি বেদখল, সাম্প্রদায়িক হামলা, নারীর উপর সহিংসতা, বহিরাগত মুসলমানদের অনুপ্রবেশ ও বসতিস্থাপন, গুচ্ছগ্রাম সম্প্রসারণ ইত্যাদি তৎপরতায় উস্কে দেয়া হচ্ছে। গঠিত হওয়ার পর পরই পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদের উদ্যোগে ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে রাঙ্গামাটিতে এবং ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে বান্দরবানে অনুষ্ঠিত পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি কমিশনের সভা ঘেরাও করে।

করোনাভাইরাস সংক্রমণ রোধে ঘোষিত লকডাউন ভেঙ্গে কক্সবাজার থেকে পালিয়ে এসে ২০২০ সালে রোহিঙ্গারা অবাধে বান্দরবান জেলায় অনুপ্রবেশ করেছে। কখনো নদী পথে, আবার কখনো পাহাড়ের ভিতর দিয়ে তারা অনুপ্রবেশ করেছে। যেমন জুন মাসে কিছু রোহিঙ্গা বান্দরবান পৌরসভার পাইংসি ঘোনাতে বসতি প্রদান করেছে। সেপ্টেম্বর মাসে রোহিঙ্গারা ব্যাপকভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামে অনুপ্রবেশ এবং জাতীয় পরিচয়পত্র প্রাপ্তির সত্যতা পাওয়া গেছে। এক্ষেত্রে স্থানীয় কিছু ক্ষমতাসীন স্বার্থান্বেষী মহল সহযোগিতা করে যাচ্ছে বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামে মৌলবাদী ও জুম্ম বিদ্বেষী কিছু ইসলামী গোষ্ঠী কর্তৃক সুপরিকল্পিতভাবে আদিবাসী জুম্মদেরকে ইসলামে ধর্মান্তরিত করার ষড়যন্ত্র বাস্তবায়িত হচ্ছে। বিশেষত কোভিড-১৯ প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার পর পরই বান্দরবান পার্বত্য জেলার আলিকদম উপজেলাসহ বিভিন্ন এলাকায় আদিবাসীদের এ ধরনের ধর্মান্তরিতকরণের ব্যাপক কার্যক্রমের খবর পাওয়া গেছে। এই তৎপরতায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সম্মতি ও সহযোগিতা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট মৌলবাদী গোষ্ঠী কর্তৃক স্বীকার করা হয়েছে। বিশেষ করে আর্থিক সুযোগ-সুবিধা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, গৃহ নির্মাণ, গরু-ছাগল পালন, সুদমুক্ত ঋণ ইত্যাদি প্রলোভন দেখিয়ে বান্দরবান জেলায় ধর্মান্তরকরণ চলছে। ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসে রোয়াংছড়ি উপজেলার আলেক্ষ্যং ইউনিয়নের ছাঃলাওয়া পাড়ায় (শীলবান্ধা পাড়া) ৫ মারমা পরিবারের ২৭ জনকে ইসলামে ধর্মান্তরিত করা হয়েছে।

এমনকি লেখাপড়া শেখানোর লোভ দেখিয়ে আদিবাসী ছেলেমেয়েদেরকে তাদের মাতা-পিতা থেকে নিয়ে ঢাকা, গাজীপুরসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় পিতা-মাতার অজান্তে মাদ্রাসায় ভর্তি করানো এবং ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত করার ঘটনা ২০২০ সালে সংঘটিত হয়েছে। অন্যদিকে জুম্ম নারীদেরকে ফুসলিয়ে কিংবা ভালবাসার প্রলোভন দেখিয়ে বিয়ে করা এবং ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত করার অনেক ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। যার সর্বশেষ বলি হয়েছে উখিয়া উপজেলার ৭ম শ্রেণির ১৫ বছরের ছাত্রী লাকিংমে চাকমা। এই অপ্রাপ্ত কিশোরীকে জানুয়ারিতে অপরহণ করে নিয়ে ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তর করে বিয়ে করার পর ডিসেম্বরে খুন করা হয়। পুলিশের পক্ষ থেকে দোষী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপ নেয়া হয়নি।

উল্লেখ্য যে, বান্দরবান জেলায় ‘উপজাতীয় মুসলিম আদর্শ সংঘ’, ‘উপজাতীয় মুসলিম কল্যাণ সংস্থা’ ও ‘উপজাতীয় আদর্শ সংঘ বাংলাদেশ’ ইত্যাদি সংগঠনের নাম দিয়ে উপজাতীয় নুও মুসলিমজনবসতিও গড়ে তোলা হয়েছে এবং এসব সংগঠনের মাধ্যমে জুম্মদের ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিতকরণের কাজ চালানো হচ্ছে। বর্তমানে বান্দরবান পৌর এলাকার বাস ষ্টেশনে ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত ৩০ পরিবারের অধিক ত্রিপুরা ও খিয়াং এবং টাংকি পাড়ায় ১৫ পরিবারের নুও ত্রিপুরা মুসলিম, লামার লাইনঝিড়িতে ১৭ পরিবারের অধিক ত্রিপুরা মুসলিম ও গয়ালমারায় ৪৫টি পরিবার, আলিকদম-থানচি সড়কের ক্রাউডং (ডিম পাহাড়) এলাকায় ১৬ পরিবার ত্রিপুরা মুসলিম, আলিকদম-থানচি সড়কের ১১ কিলো এলাকায় আরো ৪৫ পরিবারের নুও মুসলিমের বসবাস রয়েছে।

সেপ্টেম্বর মাসে সেনাবাহিনীর দূর্ভেদ্য একুশ (২১ বীর)-এর লংগদু জোনের উদ্যোগে বাঘাইছড়ি উপজেলার বাঘাইহাট ও মারিশ্যার চারকিলো নামক স্থানে নতুন করে কমপক্ষে ৫০০ পরিবার মুসলিম বাঙালি সেটেলার বসতি প্রদানের জঘন্য পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। ইতিমধ্যে বাত্যাপাড়া, ঝর্ণাটিলা, হেডম্যান টিলা, ভাইবোনছড়া, সোনাই, হাজাছড়াসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে ২০০/২৫০ পরিবারের তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। তালিকাভুক্ত প্রতি সেটেলার পরিবারকে ৩.০ একর পাহাড় ভূমি ও নগদ ১০,০০০ টাকা প্রদান করা হবে। অপরদিকে সেটেলার বাঙালিরা লংগদু উপজেলাধীন ডাকঘর মোন (বড় পাহাড়) থেকে বামে লংগদু পর্যন্ত প্রায় ৫০০ একর জায়গা তাদের নামে কবুলিয়ত আছে বলে দাবি করে জুম্মদের প্রথাগত ভূমি জবরদখলের পাঁয়তারা করছে।

সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে সেনাবাহিনীর প্রকাশ্য মদদ ও প্রশ্রয় প্রদান:

পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের আন্দোলনকে নস্যাৎ করা, পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতিকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করা, সর্বোপরি জুম্মকে দিয়ে জুম্মদেরকে জাতিগতভাবে নির্মূলীকরণের জন্য সংস্কারপন্থী খ্যাত জেএসএস (এমএন লারমা), ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) ও এএলপি থেকে দলচ্যুত মগ পার্টি নামে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সেনাবাহিনী ও ক্ষমতাসীন দল আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে চলেছে। এসব সশস্ত্র গোষ্ঠী কর্তৃক ২০২০ সালে ১০০টি মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা সংঘটিত করা হয়েছে। এসব ঘটনায় ২১ জনকে হত্যা করা হয়েছে, ৫০ জনকে অপহরণ করা হয়েছে, ১৭ জনকে মারধর ও হয়রানি করা হয়েছে, ৮ জনকে হত্যার হুমকি প্রদান হয়েছে, জনসংহতি সমিতির ৮২ জন সদস্য ও সমর্থকদের বিরুদ্ধে সাজানো মামলা দায়ের করা হয়েছে। এছাড়া মগ পার্টি কর্তৃক ১২টি বাড়ি জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে।

২০২০ সালে সংস্কারপন্থী ও ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) সশস্ত্র সদস্যদের রাঙ্গামাটি জেলার বরকলের সুবলং বাজার, লংগদু উপজেলার তিনটিলা, দীঘিনালার বাবুছড়া, কাপ্তাই ও রাজন্থলী উপজেলাসহ খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানের সদর জেলার বিভিন্ন স্থানে সশস্ত্রভাবে মোতায়েন রেখে চুক্তি স্বাক্ষরকারী জনসংহতি সমিতির সদস্য ও চুক্তি সমর্থকদের উপর এসব সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের মাধ্যমে সেনাবাহিনী সন্ত্রাস চালিয়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি প্রশাসন ও নিরাপত্তা বাহিনীর নাকের ডগায় এসব সন্ত্রাসী গোষ্ঠী লক্ষ লক্ষ টাকার চাঁদাবাজি করে চলেছে। সেপ্টেম্বরে সেনাবাহিনীর ২১ বীর (দুর্ভেদ্য একুশ)-এর লংগদু সেনা জোনের পক্ষ থেকে সংস্কারপন্থী সশস্ত্র সন্ত্রাসীদেরকে ২৫ সেট সেনাবাহিনীর ইউনিফর্ম প্রদান করা হয়েছে বলে জানা গেছে। ডিসেম্বর মাসে সংস্কারপন্থীরা লংগদু থেকে জনসংহতি সমিতির সদস্য ও সমর্থকদের ২৮টি পরিবারকে উচ্ছেদের তৎপরতা চালায়।

২০২০ সালে এসব সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সাথে সেনাবাহিনী যৌথভাবে বিভিন্ন জায়গায় টহল প্রদান ও তল্লাসী অভিযান চালাতেও দেখা গেছে। যেমন ডিসেম্বরের শেষ দিক থেকে রাজস্থলীতে সেনাবাহিনী ও তাদের মদদপুষ্ট ‘মগ পার্টি’ যৌথভাবে গ্রামে গ্রামে টহল দিয়ে চলছে। সেনাবাহিনীর এজেন্ডা মোতাবেক মগ পার্টি কর্তৃক জনসংহতি সমিতির সদস্য ও সমর্থকদের খুন ও অপহরণ করতে না পারার কারণে মগ পার্টির উপর ক্ষুব্ধ হয়ে ডিসেম্বরে রাজস্থলী সেনা সাব-জোনের কম্যান্ডার মেজর মঞ্জুর ‘মগ পার্টি’কে আদেশ দিয়ে বলেছেন, ‘আমরা লাশ চাই, আমাদেরকে লাশ দেখাও। তোমরা কোথা থেকে লাশ আনবে আমরা জানি না।’ এভাবে সেনাবাহিনী এসব সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোকে মদদ ও প্রশ্রয় দিয়ে খুন-খারাবি, অপহরণ ও সন্ত্রাসের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে।

প্রেস বিজ্ঞপ্তি

Facebook Comments
Print Friendly, PDF & Email

এক নজরে

বাংলাদেশ খ্রীষ্টান এসোসিয়েশনের (বিসিএ) বর্ধিত সভা অনুষ্ঠিত

আচিক নিউজ ডেস্ক : বাংলাদেশ খ্রীষ্টান এসোসিয়েশনের (বিসিএ) বর্ধিত সভা ঢাকা ক্রেডিটের ডানিয়েল কোড়াইয়া সভাকক্ষ থেকে …

error: Content is protected !!