শিরোনাম
প্রথম পাতা / আদিবাসী / সিমসাকবো বলসাল ব্রিংনি ব্লাকবা

সিমসাকবো বলসাল ব্রিংনি ব্লাকবা

পাভেল পার্থ : গহীন শাল অরণ্যে হা.বিমার মান্দিদের বসতে এককালে কোনো চু ছিল না। চু মানে মান্দিদের নিজস্ব পানীয়। নানান জাতের জুমধানের ভাত রেঁধে প্রবীণ মান্দি বয়স্ক নিজের ঘরেই এই চু তৈরী করেন। রাষ্ট্র কর্তৃক জুম চাষ নিষিদ্ধ হওয়ার আগ পর্যন্ত যখন হাবাহ্আু (জুম) ছিল তখন মি.মিদ্দিম ধানের চু ছিল পানের জন্য সেরা। মান্দি সমাজে মেংমেংখারিরাই পয়লা চু তেরী করেছিল নিজেদের চাকে। মেংমেংখারি পোকার চাক থেকে এই চু সংগ্রহ বেশ কঠিন ছিল। মান্দিরা গহীণ বনে ঘুরে ঘুরে দেবতা ব্রারা-দুগনির ধারে সহজ ভাবে চু চাইল। তারবাদে চু তৈরী হল স্নেংনাগোড়া পোকার কানের গোড়ায়। এখান থেকেও চু সংগ্রহ করা সবসময় মান্দিদের জন্য সহজ ছিল না। তখন মান্দিরা জানতে পারল মি.মান্দি (মান্দি জুম ধান) থেকে চু তৈরী করতে হয়। নানান জাতের ঔষধি লতাগুল্মের নানান অংশ দিয়ে চুমান্থি (প্রাকৃতিক ইস্ট) তৈরী করতে হয়। মান্দিদের ভেতর পয়লা চু তৈরী করেন গানজেং নকমা দুজংরাচ্ছা। এরবাদে এই চু পয়লা রান্দিবিমা রাই মিচ্চিকের বাড়িতে রূগালা কৃত্যে ব্যবহৃত হয়। দুনিয়ার প্রথম মান্দি সঙ নকমা (গ্রামপ্রধান) জারেম নকমার বাড়িতে এই চু সমাজের সবাই মিলে পান করে। মধুপুর গড়ের মান্দি নারীরাও সময়ের ধারাবাহিকতায় শাল জংগলের নানান লতাগুল্ম দীর্ঘ দিনের পরীক্ষা নিরীক্ষার ভেতর দিয়ে এই চু তৈরীতে ব্যবহার করা শুরু করেন। তারপর কেটে যায় কত দিন কত রাত। মধুপুর শালবনে আর হাবাহুয়া করতে পারেন না মান্দিরা। আর মিজামে (গোলাঘর) জমা থাকে না মি.মিদ্দিম, মি.জেংগেম, মি.খচ্চু , মি.সারেংমাসহ নানান মান্দি জুম ধান।

আমেরিকার ওয়াশিংটন ডিসি শহরে অবস্থিত বিশ্বব্যাংক এর সদর দ্প্তরে ‘সিজিআইএআর (কনসালটেটিভ গ্র“প অন ইন্টারন্যাশনাল এগ্রিকালচারাল রিসার্চ) এর কেন্দ্রীয় কার্যালয়। সিজিআইএআর নির্দেশে এবং পরিকল্পনায় দুনিয়ার তাবত শস্য ফসলের বীজ ও জাত চলে যায় কৃষি উন্নয়ন গবেষণায়। ফিলিপাইনের লস বানুস বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে অবস্থিত ‘ইরি (ইন্টারন্যাশনাল রাইস রিসার্চ ইন্সটিটিউট)’ বাংলাদেশসহ দুনিয়ার নানান প্রান্তের স্থানীয় ধানজাত গুলো গবেষণার নাম করে ডাকাতি করে নিয়ে যায়। এর ভেতর মি.মিদ্দিম মি.সারেংমা এইসব মান্দি জুম ধানগুলোও আছে। শালবনের মান্দি গ্রামের মান্দি জুম ধান আজ শালবন এলাকায় নাই, আছে লসবানুসে ইরির লাশঘরে। ইরি এইসব মান্দি ধানের এক্সেশন নাম্বার দিয়েছে মা্িন্দদের না জানিয়ে। অথচ বাংলাদেশ জাতিসংঘের আন্তজার্তিক প্রাণবৈচিত্র্য সনদ (সিবিডি ১৯৯২) স্বাক্ষর ও অনুমোদন করেছে। সিবিডির নীতি অনুযায়ী লোকায়ত জ্ঞান ও প্রাণসম্পদ ব্যবহারে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অনুমতি ও সম্মতি নেয়ার কথা। এসব নীতি ও সনদ না মেনে দেশের আদিবাসীদের সব সম্পদই আজ চলে যাচ্ছে কর্পোরেট নিয়ন্ত্রণে। এইসব ধান হয়তোবা ইরি এতদিনে বদলে ফেলেছে বা অন্য কোন ভাবে ইরি থেকে কোনো কোম্পানী এটি প্যাটেন্ট নিয়ে একতরফা বীজের ব্যবসা করছে। এসব ফিরিস্ত আজ থাক।

আমরা আজকের আলাপে এখন একটি গল্প বলা শুরু করবো।

একদেশে ছিল এক শালবন। নাম তার মধুপুর। মধুপুর শালবনের আদিবাসিন্দা মান্দিরা এই এলাকার নাম দিয়েছেন হা.বিমা মানে মাতৃভূমি। আর শালবনের মান্দি নাম বলসালব্রিং। বর্তমান টাঙ্গাইল জেলার মধুপুর উপজেলার এই শালবনের ভেতর জয়নাগাছা নামের এক মান্দি গ্রামে সাইলো স্নাল আর নেজেন নকরেকের এক পুত্র গ্রামের সব মান্দি শিশুর সাথেই বড় হয়ে উঠে। বড় হতে হতে তার চেনা হয়ে যায় বনের ঝরে পড়া শালপাতা বা বনআলু বা দুয়েকটা ঔষধের গাছ যাই আনা হোক না কেন তা আনতে হয় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে। কারণ এই জংগল বনবিভাগ পাহাড়া দেয়। রূপকথার গল্প গুলোতে যেমন সে শুনেছে তার আচ্চু-আম্বির(দাদু-নানী) কাছে। রাক্ষসপুরীতে রাক্ষস-দেও-সকস-শয়তান পাহাড়া দেয় রাজকন্যাকে। শালবনও তেমনি যেন এক বন্দী রাজকন্যা। রাক্ষসদের কবল থেকে রাজকন্যাকে উদ্ধার করতে তারও মন চায়। তারও দিগ্গি-বানদী হতে ইচ্ছে করে। তারও মাঝে মাঝে শেরানজিং হতে ইচ্ছে করে। কিন্তু দিন যায়, মাস যায়, বছরের পর বছর। বনবিভাগের বন্দুকের গুলি কমে না। এত গুলি কেনার টাকা পায় কোথায় বনবিভাগ? এর ভেতর কত কি হয়, সংরক্ষিত বনে সংরক্ষণ বাদ দিয়ে বিমানবাহিনীর ফায়ারিং ও বোম্বিং রেঞ্জ তৈরী হয়, শাল বন কেটে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের রাবার বাগান ও একাশিয়া বাগান হয়। বনবিভাগ গুলি করে হত্যা করে বিহেন নকরেককে। খুন হয় একে একে গীদিতা রেমা, অধীর দফো, নিন্তনাথ হাদিমা, সেন্টু নকরেক। সামাজিক বনায়নের নাম করে শালবন তুলে দেয়া হয় বহিরাগত বাঙালিদের কাছে। আনারসের পর শালবন হয়ে ওঠে কলার বাগান। সিনজেনটা, বায়ার ক্রপ সায়েন্স, এসিআইসহ কর্পোরেট কোম্পানিগুলোর বিষ-হরমোনের বাণিজ্য মধুপুরে কলাচাষকে চূড়ান্ত করে। কর্পোরেট নিয়ন্ত্রিত এই কলার বাগানের এক নিতান্ত সাধারন দিনমজুর হিসেবেই দিন কাটে সেই মান্দি ছেলের। খুব ভোরে ঘুম থেকে ওঠে কলার বাগানে যেতে হয়, বাগানে বিষ দেয়া, সার দেয়া, কলায় হরমোন স্প্রে করা, কলাছড়ি কাটা, কলা ট্রাকে বোঝাই করা কত কি কাজ। সেই মান্দি ছেলে যখন পান্থি (যুবক) হয় তখন তার বিয়ে হয় সীতা নকরেকের সাথে। এখন আর মান্দি ছেলেরা নক্রম (জামাই হয়ে মেয়ের বাড়ীতে যাওয়া) হয় না। এখন যাও কিছু চু তৈরী হয় সবই ব্রিধান-২৮, ব্রি-ধান-২৯ এর ভাত থেকেই। নামা বা বাইদ জমিতে এইসব ধানের জমিনে মান্দি যুবকও অন্যদের সাথে কাজে যায়। ওইসব জমিতেও সিনজেনটার সার-বিষ আর বীজ ব্যবহৃত হয়। এরই মাঝে আবারো ২০০৩ সালে শকস-শয়তান-রাক্ষসেরা শালবন আক্রমণ করে। রাক্ষসের নাম বনবিভাগ আর আক্রমণের নাম জানা হয় ‘ইকোপার্ক’। এই প্রকল্পই ১৯৬২ সন থেকে মধুপুর জাতীয় উদ্যান উন্নয়ন প্রকল্প হিসেবে বাস্তবায়ন করার উপুর্যপরি হামলা চালাচ্ছে বনবিভাগ। মান্দি যুবকও তার দিনমজুরীর ফাঁকে ফাঁকে মধুপুর জাতীয় উদ্যান উন্নয়ন প্রকল্পের বিরুদ্ধ শুরু হওয়া ইকোপার্ক বিরোধী আন্দোলনে যোগ দেয়। সেদিন ছিল ২০০৪ সালের ৩ জানুয়ারি। শীতকালের শিশির কলাপাতা থেকে সিনজেনটার বিষ খেয়ে খেয়ে মৃত শালবনের দেল্লাংয়ে (মৃতের স্মরণে নির্মিত ঘর) আছড়ে পড়ছিল। যেন শালবনের শিশিরের শেষ নিয়তি কর্পোরেট বিষে মৃতু্যূ। জালাবাদা, চুনিয়া, সাধুপাড়া, জয়নাগাছা, সাতারিয়া, গায়রা, রাজাবাড়ি, জলছত্র, গাছাবাড়ি, জলই, ইদিলপুর, সাইন্যামারি, টেলকী, বেদুরিয়া, ক্যাজাই, পেগামারিসহ নানান গ্রাম থেকে হাজারে হাজার মান্দি-কোচ বর্মণ এমনকি কিছু বাঙালিরাও জমায়েত হয় রাক্ষসদের হাত থেকে বন্দী রাজকন্যাকে বাঁচাতে। জমায়েত থেকে গ্রামের মানুষ বলে, আমরা ইকোপার্ক চাই না। রাক্ষস বনবিভাগ বলে, হাউ মাউ খাউ আদিবাসীদের গন্ধ পাও। হেলিবার্টন, রেথিয়ন কোম্পানির অস্ত্র ব্যবসার ভাগ হয়তো বনবিভাগ পায়। তা না হলে ঝরাশালপাতা কী কুড়ালেও কেন বনবিভাগ গুলিতে ঝাঁঝরা করে দেয় আদিবাসী শরীর? তো, বনবিভাগ ইকোপার্কবিরোধী মিছিলে গুলি চালায়। কর্পোরেট অস্ত্র ব্যবসার হাত থেকে শালবন বাঁচাতে রাষ্ট্রের গুলিতে শরীর ঝাঁঝরা হয়ে যায় বেদুরিয়া গ্রামের আরেক মান্দি কিশোর উৎপল নকরেকের। আর সেই মান্দি যুবক রাক্ষসদের হাত থেকে রাজকন্যাকে বাঁচাতে নিজের বুক ও কলিজা পেতে দেয়।

গল্পটির এইজায়গাখানিই রূপকথার গল্পের সাথে দারুন অমিল। মান্দি যুবকের সাথে আর মিলন হয় না রাজকন্যার। রাক্ষস বনবিভাগের হাতে বন্দী বলসাল রাজকন্যা। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকসহ বহুজাতিক উন্নয়ন রাক্ষসরা আগেই রাজকন্যার মা বাবা ভাই বোন আত্মীয় স্বজন পাড়া প্রতিবেশীকে খেয়ে ফেলেছিল । বাকী আছে কেবল রাজকন্যার একটুকরা শালের শরীর। রাজকন্যাকেও বনবিভাগ বন্দুক আর বনআইন দিয়ে বেহুঁশ করে রাখে সারাদিন। বনবিভাগ রাজকন্যার ৩০০০ একর কোর এলাকাকে দেয়াল দিয়ে ঘিরে ইকোপার্ক বানাতে চায়। মান্দি যুবক ত্ইা অন্যদের সাথে রাজকন্যাকে বাঁচাতে জীবন দিয়ে দেয়। যুবককে খুন করে বনবিভাগ আবার যুবককেই আসামী করে টাঙ্গাইল কোর্টে তার নামে মামলা করে। যুবকের মাসুম বাচ্চা রাত্রি নকরেক আর উৎস নকরেক তারা জানেনা তাদের বাবা কেন আসে না? উৎস-রাত্রির মা সীতা নকরেক জানে জংগলে এমন হরহামেশাই হয়। মান্দি নারীদের গন্তব্য তার জানা হয়ে গেছে। ফরেস্টের লাত্থি গুতা বন্দুকের গুলি খেয়ে জ্বালানির জন্য কিছু লাকড়ী বা বনআলু সংগ্রহ, কলার বাগানের মজুর, মিশনে ফরমাইশ, শহরে কাজের মেয়ে আর খুব ভালো কপাল হলে ঢাকা শহরের বিউটি পার্লার।

গল্পটি আমাদের শেষ হচ্ছে না।

এই গল্পের মান্দি যুবকের নামই পীরেন স্নাল। পৃথিবীর ইতিহাসে ইকোপার্কবিরোধী আন্দোলনের পয়লা শহীদ। এই গল্পের একটা স্থিতিশীল পরিণতি হতে পারে যদি রাষ্ট্র মধুপুর জাতীয় উদ্যান উন্নয়ন প্রকল্প বা ইকোপার্ক প্রকল্প বা বনভূমিতে এরকম কোনো বিনাশী প্রকল্প আর গ্রহণ না করে। যদি উপনিবেশিক বনআইন বাতিল হয়। যদি কর্পোরেট নিয়ন্ত্রিত একতরফা বাজারি ফসলের চাষ না হয়। আর এইগুলোই হল আজকে রাক্ষসের হাত থেকে বন্দী রাজকন্যাকে বাঁচানোর একমাত্র কায়দা। পীরেন স্নাল হত্যার পর আবারো বনবিভাগ গুলি করে ঝাঁঝরা করে দিয়েছিল সাতারিয়া গ্রামের শিশিলিয়া স্নালকে। টাঙ্গাইল বন বিভাগের তৎকালীন বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আবু হানিফ পাটোয়ারী দৈনিক ইনকিলাবে মধুপুর জাতীয় উদ্যান উন্নয়ন প্রকল্পের একটি দরপত্র আহবান করেছিলেন। পীরেন শহীদ হওয়ার পরও বনভিাগ ১৪,০০০ ফুট দেয়াল দিয়ে শালবনকে বারবার মারতে চেয়েছিল। কেটে দিয়েছিল বাসন্তী রেমার কলার বাগান। শালবনের এমনতর লাগাতার মৃত্যুদন্ডের বিরুদ্ধে জনগণই দাঁড়িয়েছে নির্ভীক। দিগ্গি বান্দি সেই সাহসী মান্দি বীর, যাদের রক্তের উত্তরাধিকার পীরেন স্নাল, উৎপল নকরেকরা। উৎপলের মেরুদন্ড বারবার ঝিলিক দিয়ে উঠবেই। আবারো কোনো পীরেন বা উৎপল সাহসী হাতে বনবিভাগের মাস্তানীকে প্রশ্ন করবেই। আমরা সহযোদ্ধা আছি পীরেনের সাথে। উৎপলের সাথে। পীরেন আমাদের জানিয়ে গেছে অরণ্য বাঁচাতে কীভাবে জেড়ে থাকতে হয়, জাগিয়ে রাখতে হয় বুকের দরদ। আজ যখন বাসন্তী রেমার কলাবাগান খুন করে বনবিভাগ বা চিম্বুক পাহাড় মার্কিন ম্যারিয়ট হোটেলের মুনাফায় বন্দী হয়, তখনো দাঁড়িয়েছে অজ¯্র পীরেন। সাহসী উৎপল। আজ এই করোনাকালে পীরেনকে নিয়ে লেখা আমার ২০০৬ সনের একটি লেখার শিরোনাম বারবার মনে আসছে। জাগো শালবনের সাহসী যোদ্ধা, জাগো। সিমসাকবো বলসালব্রিংনি ব্লাকবা সিমসাকবো।

পাভেল পার্থ

গবেষক, প্রতিবেশ ও প্রাণবৈচিত্র্য সংরক্ষণ।

ই-মেইল: animistbangla@gmail.com

 

 

 

Facebook Comments
Print Friendly, PDF & Email

এক নজরে

টাঙ্গাইলের ঘাটাইলে আদিবাসী নারীকে নির্যাতনের প্রতিবাদে মানববন্ধন

আচিক নিউজ ডেস্ক : টাঙ্গাইলের ঘাটাইলের মালিরচালা গ্রামে চুরির অপবাদে আদিবাসী নারীকে গাছের সঙ্গে বেঁধে …

error: Content is protected !!