শিরোনাম
প্রথম পাতা / আদিবাসী / করোনা মহামারিতে আদিবাসীদের টিকে থাকার সংগ্রাম

করোনা মহামারিতে আদিবাসীদের টিকে থাকার সংগ্রাম

বিভূতী ভূষণ মাহাতো : করোনা ভাইরাসের মহামারিতে আদিবাসীদের জীবনযুদ্ধের সংগ্রাম আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। এই মহামারি শুধু আদিবাসী নয় সারা বিশ্বের মানুষের জীবন-জীবিকার স্বভাবিক গতিপথ পরিবর্তন করে দিয়েছে। প্রকৃতি যেন নিজের মত করে সাজাতে চাচ্ছে এই ধরণীকে। সেই প্রভাব পরছে মানুষের স্বাভাবিক জীবনে।করোনার প্রভাব অন্যান্যদের তুলনায় আদিবাসী তথা প্রান্তিক মানুষের জীবন-জীবিকায় অনেক বেশি পড়েছে।সাধারণ ভাবেই আদিবাসীরা সংগ্রাম করে বেঁচে থাকতে হয়। সেট হতে পারে আত্ম-পরিচয়,  ‍ভূমির অধিকার, রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অধিকারের সংগ্রাম। আদিবাসীদের বেঁচে থাকাটাই একটা সংগ্রাম। কিন্তু বর্তমানে করোনার এই পরিস্থিতিতে তাদের জীবন সংগ্রাম আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশের অধিকাংশ আদিবাসী ভূমিকে কেন্দ্র করেই বেঁচে রয়েছে। ক্রমাগত ভূমি কমতে থাকায় বর্তমানে আদিবাসীরা বিভিন্ন পেশায় যুক্ত হয়েছে। অর্থনৈতিকভাবে টিকে থাকার জন্য অনেকেই গ্রাম ছেড়ে শহরে পাড়ি দিয়েছে। উদ্দেশ্য অর্থ উপার্জন করে পরিবারের সাথে সুখে থাকা। করোনা ভাইরাস যেহেতু পৃথিবীর চলমান স্বভাবিক গতিপথ পরিবর্তন করে দিয়েছে। গতিপথ পরিবর্তনের কারণে এদেশের আদিবাসী তথা খেটে খাওয়া প্রান্তিক মানুষের জীবনের গতিপথও পরিবর্তন হয়েছে।
করোনা প্রভাবে বাংলাদেশের আদিবাসীরা ভালো নেই। করোনায় দীর্ঘদিন থেকে কর্মহীন হয়ে জীবন যাপন করছে। এছাড়াও থেমে নেই আদিবাসীদের প্রতি মানবাধিকার লংঘনের ঘটনা। আদিবাসী শিক্ষার্থীরা হয়ে পড়ছে শিক্ষা বিমূখ। উত্তরবঙ্গের রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের আদিবাসীদের সাঁওতাল, উরাও, মুন্ডা, বেদিয়া মাহাতো, ভূমিজ, কুর্মী মাহাতো সহ প্রায় ৩২টি জাতিসত্তার বিশাল অংশ কৃষি শ্রমিক ও গার্মেন্টস শ্রমিক হিসেবে কাজ করে। কৃষি শ্রমিকেরা করোনার কারণে অন্য অঞ্চলে কাজে যেতে পারেনি। এতে কর্মহীনভাবে এলাকায়বসে থাকায় অর্থনৈতিক সংকটে রয়েছে। গার্মেন্টস শ্রমিকেরা করোনা মহামারির কারণে কর্মহীন হয়ে এলাকায় অবস্থান করতে বাধ্য হচ্ছে। বিউটি পার্লার কর্মী হিসেবে কাজ করা ময়মনসিংহ অঞ্চলের গারো জাতিসত্তার নারীরাও কর্মহীন হয়ে বসে আছে। এতে তারা অর্থনৈতিক সংকটে দিনাতিপাত করছে। পাবর্ত্য অঞ্চলের আদিবাসীরাও কর্মহীন থাকায় খাবার সংকটের মধ্যে জীবন যাপন করছে। খুলনা ও উপক‚ল অঞ্চলের আদিবাসীরা করোনা ও ঘুর্ণিঝর আমফানের ছোবলে দুর্বিষহ দিন পার করছে। আমফানের কারণে তারা আরও বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। তাদের ঘরবাড়ি পানিতে ডুবে ও ভেংগে গেছে। এতে তারা অর্তনৈতিকভাবে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। করোনার প্রভাবে টিকে থাকতে অনেকেই পেশা পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছে।
করোনায় সরকারি ত্রাণ সহায়তা আদিবাসীদের মাঝে খুব কমই পৌঁছেছে। অধিকাংশ এলাকায় আদিবাসীরা খুবই কম ত্রাণ সহায়তা পেয়েছে। যেসকল এলাকায় আদিবাসী প্রতিনিধি রয়েছে সেসব এলাকায় আদিবাসীরা পর্যাপ্ত ত্রাণ সহায়তা পেয়েছে। আর যেসকল এলাকায় আদিবাসী প্রতিনিধি নেই সেসকল এলাকার আদিবাসীরা ত্রাণ পেলেও তা অনেক কম। কিছু কিছু এলাকায় এনজিওগুলোও অল্পসংখ্যক সহায়তা দিয়েছে। করোনায়আদিবাসীদের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে বিশেষ কোনো প্রণোদনাও নেই।
করোনা মহামারিতেও আদিবাসীদের মানবাধিকার লংঘনের ঘটনাও থেমে নেই। আদিবাসীদের জমি জবরদখল, হামলা নির্যাতন চলছেই। করোনাকালীন সময়েও আদিবাসীদেরজমি জবরদখল, নারী ধর্ষন, হত্যা, হামলা-মামলা, নির্যাতনের অনেক ঘটনা ঘটছে। এমনকি শশ্মান জবরদখলের চেষ্টাও করা হয়েছে। জাতীয় আদিবাসী পরিষদমনে করছে যে, অন্যান্য সময়ের তুলনায় করোনাকালীন সময়ে আদিবাসীদের প্রতি মানবাধিকার লংঘনের ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে।
আদিবাসী শিক্ষার্থীদের শিক্ষা পরিস্থিতি ব্যাপক নাজুক হয়ে পড়েছে। করোনা ভাইরাসের কারণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধের শুরু থেকেই পাঠ্যপুস্তকের সাথে তাদের সম্পর্কের ব্যবধান বেড়েছে। বর্তমানে লক্ষ্য করা গেছে বইয়ের সাথে তাদের সম্পর্কই নাই। পড়াশুনার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে। অভিভাবকেরাও তেমন গুরুত¦ দিচ্ছে না বললেই চলে। বাবা-মায়েরাও সন্তানদের পড়াশুনার জন্য চাপ দিচ্ছেন না। এতে করে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা বিমূখ হয়ে যাচ্ছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় তারা পড়াশুনা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। ক্লাসের কোন চাপ না থাকাই পরিবারের তাগিদেই অনেক আদিবাসী শিক্ষার্থীই বাবা-মায়ের সাথে মাঠের কাজে দিনমজুরের কাজ এবং অন্যান্য পেশায় জড়িয়ে যাচ্ছে। এতে করে তারা অর্থ উপার্জনের পথে ধাবিত হচ্ছে এবং পড়াশুনায় আগ্রহ কমে যাচ্ছে। এমনকি অনেক শিক্ষার্থী নেশার সাথেও জড়িয়ে পড়ছে। এছাড়াও এসএসসি পাশকৃত শিক্ষার্থীরা উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তি হতে পারছে না এবং এপ্রিল মাসের এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত হওয়ায় শিক্ষার্থীরা মানসিকভাবে ভেংগে পড়েছে।
শিক্ষার্থীদের পড়াশুনায় মনোযোগী করতে সরকার টেলিভশন ও অনলাইন ভিত্তিক ক্লাসের পদক্ষেপ নিলেও আদিবাসী শিক্ষার্থীরা এসকল সুবিধা গ্রহণ করতে পারছেনা। তাদের পরিবারের আর্থ-সামাজিক অবস্থার কারণেই তারা এই কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করতে পারছেনা। কারণ কারো বাড়িতে টেলিভিশন নেই, এন্ড্রোয়েড মোবাইল বা ল্যাপটপ নেই, মোবাইল থাকলেও ইন্টারন্টে প্যাকেজ কেনার সামর্থ্য নেই ইত্যাদি। সম্প্রতি ব্যাকের একটি গবেষনায় দেখানো হয়েছে, সংসদ টেলিভিশন কর্তৃক প্রচারিত ক্লাসে ৭৫ শতাংশ আদিবাসী শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করছে না।
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের গবেষণায় বলা হয়েছে, দেশে চলমান মহামারি করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে সংসদ টেলিভিশনে প্রচারিত শ্রেণি পাঠদানে অধিকাংশ শিক্ষার্থীর আগ্রহ নেই। ৫৬ শতাংশ শিক্ষার্থী এতে অংশ নিচ্ছে না। সবচেয়ে বেশি ৭৫ শতাংশ আদিবাসী শিক্ষার্থী সংসদ টেলিভিশনের ক্লাসে অংশ নিচ্ছে না। এরপর রয়েছে মাদরাসা, গ্রামাঞ্চল ও প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীরা। তারা টেলিভিশনের ক্লাসে কেন অংশ নিচ্ছে না- জরিপের সময় এমন প্রশ্নের জবাবে ৭১ শতাংশ শিক্ষার্থী কিছু সীমাবদ্ধতার কথা জানিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে- তাদের কারও বাড়িতে টিভি নেই, আবার কারও বাড়িতে বিদ্যুৎ নেই। আবার কারও কারও বাড়িতে ক্যাবল লাইন নেই। এ সমস্যার কারণে তারা টিভি ক্লাসের বাইরে রয়েছে। টেলিভিশনের ক্লাসে যে ৪৪ শতাংশ শিক্ষার্থী অংশ নিচ্ছে তাদের মধ্যে ৬৪ শতাংশ জানিয়েছে, এসব ক্লাস তাদের কাজে লাগছে না। [সূত্র: জাগোনিউজ২৪.কম, ২০ জুন ২০২০, ‘টেলিভিশন ক্লাসে আগ্রহ নেই ৫৬ শতাংশ শিক্ষার্থীর’] এতে আদিবাসী ছাত্র পরিষদ আশংকা করছে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর ব্যাপক সংখ্যক আদিবাসী শিক্ষার্থী শিক্ষা থেকে ঝরে পড়বে। এতে করে আদিবাসীরা শিক্ষায় আরেকদফা পিছিয়ে পড়বে।
করোনায় আদিবাসী যুবদের বিশাল অংশ কর্মহীন অবস্থায় রয়েছে। আদিবাসী যুবরা কর্মসংস্থানে যোগ দিতে পারছে না। করোনার কারণে সরকারি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষাগুলো স্থগিত ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানেও নিয়োগ প্রক্রিয়া কম থাকায়যুবরা হতাশা ও ভবিষ্যত কর্মসংস্থান নিয়ে আশংকার মধ্যে দিন পার করছে। আদিবাসী যুবদের বিষয়ে আদিবাসী যুব পরিষদ ভীষণ উদ্দীগ্ন। কারণ যুব সমাজ কর্মহীন থাকলে কোন জাতির উন্নয়ন ত্বরান্নিত করা যায়না। সমাজে অপরাধ প্রবণতা বেড়ে যায়।
করোনা আদিবাসীদের সংস্কৃতিতে বিরাট বাধা সৃষ্টি করেছে। সংস্কৃতি হচ্ছেআদিবাসীদের প্রাণ। আদিবাসীরা মনে করে নিজস্ব সংস্কৃতির কারণেই আদিবাসীরা আদিবাসী আত্ম-পরিচয় নিয়ে বাঁচতে পারছে। তাই সংস্কৃতি চর্চায় আদিবাসীদের কোনো কমতি নেই। সংস্কৃতির কারণে আদিবাসীরা অনন্য। কিন্তু করোনা মহামারি আদিবাসীদের সংস্কৃতিতে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে। আদিবাসীদের সংস্কৃতি চর্চা দলগত বা সামষ্টিক অংশগ্রহন প্রক্রিয়া। করোনায় দলগত বা সামষ্টিকভাবে অংশগ্রহণে বিধিনিষেধ থাকায় স্বতঃস্ফুর্তভাবে আদিবাসীরা নিজেদের সংস্কৃতি চর্চা, পূজা পার্বণ, প্রথা পালন করতে পারছেনা। তাই করোনা মহামারিকে আদিবাসীদের সংস্কৃতি চর্চার বড় বাঁধা হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

আদিবাসীরা করোনার প্রভাব থেকে নিজেদের টিকিয়ে রাখতে চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। আদিবাসীদের নিজস্ব খাবার ব্যবস্থার কারণেই আদিবাসীরা নিজেদের অন্যদের তুলনায় একটু নিরাপদে রাখতে পারছে বলে অনেকেই ধারণা করছে। এছাড়াও রৌদ্রে কাজ করতে অভ্যস্থ থাকায় শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা পর্যাপ্ত তাই আদিবাসীদেরকে অনেকটাই নিরাপদ ভাবছেন অনেকেই। কিন্তু আদিবাসী জাতিসত্তাসমূহের আশেপাশের অধিকাংশ মানুষ যদি করোনা আক্রান্ত হয়ে পড়ে তখন আদিবাসীদের নিরাপদ থাকাটা সহজ হবে না।
আদিবাসীরা প্রান্তিক হওয়ায় সরকারের পক্ষ থেকে বিশেষ প্রণোদনার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন বলে মনে করি। এছাড়াও আদিবাসী শিক্ষার্থীদের শিক্ষা, যুবদের কর্মসংস্থান ও আদিবাসী সংস্কৃতির দিকেও বিশেষভাবে নজর দিতে হবে।

লেখক: বিভূতী ভূষণ মাহাতো,

কেন্দ্রীয় সদস্য, জাতীয় আদিবাসী পরিষদ

ইমেইল: bivuti.ais@gmail.com

Facebook Comments

এক নজরে

মধুপুর বনে বাসন্তীদের হাহাকার-দেশ রুপান্তর

সঞ্জীব দ্রং : রাষ্ট্রযন্ত্র যে তার সাধারণ ও গরিব মানুষের সঙ্গে কী রকম নিষ্ঠুর আচরণ করে, …

error: Content is protected !!