শিরোনাম
প্রথম পাতা / আইন / আমরা কি আদিবাসী পরিচয় দিতে পারি?

আমরা কি আদিবাসী পরিচয় দিতে পারি?

মিকরাক ম্রং সোহেল : আদিবাসী পরিচয়ের জন্য আমরা অনেকদিন ধরে দাবি করে আসছি। মিছিল, মানববন্ধন, সমাবেশ, সেমিনার, আলোচনা সভাসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে উত্থাপন করা হয়েছে। স্মারকলিপি পেশ করে আমাদের চাওয়া বুঝানো হয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে। আমাদের প্রাণের দাবির সাথে অনেকেই একাত্মতা প্রকাশ করেছে। এরপরও সরকার ২০১০ সালে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক আইন নামে একটি আইন প্রণয়ন করে। এই আইনের সূত্রে কিছু ব্যক্তিত্ব বোঝান, দেশে আদিবাসী নেই, আমরা আদিবাসী পরিচয় দিতে পারবো না। যে মিডিয়া আগে আদিবাসী বলতো, তারাও কৌশলে এড়িয়ে যাওয়া শুরু করে। আমাদের অনেকের মনেও প্রশ্ন জাগে, আমরা কি এই আইনের পর নিজেদেরকে আদিবাসী পরিচয় দিতে পারবো। অনেকে সরকারি কোন অনুষ্ঠানে নিজেকে আদিবাসী পরিচয় দেওয়া থেকে বিরত থাকে। ভেবেছে, পরিচয় দিলে আবার কোন ঝামেলায় না পড়ে যায়।

এই বছর সেই আইনের দশ বছর চলছে।
এই আইন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী কারা এর একটা ব্যাখ্যা দিয়েছে। আইনটির ২(২) ধারায় বলা হয়েছে- “ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী” অর্থ তফসিলে উল্লিখিত বিভিন্ন আদিবাসী তথা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ও শ্রেণীর জনগণ”। এই বাক্য খুব সহজেই বোধগম্য হতো যদি ‘তথা’ শব্দ যুক্ত না করা হতো। বাক্যটি সম্পূর্ণ বুঝার জন্য ‘তথা’ শব্দের অর্থ জানা দরকার। বাংলা একাডেমীর বাংলা-বাংলা অভিধানে ‘তথা’ শব্দের কয়েকটি অর্থের মধ্যে একটি হল উদাহরণ বা দৃষ্টান্ত বা যথা। কোন বিষয়কে সুনির্দিষ্টভাবে বুঝানোর জন্য উদাহরণ বা যথা ব্যবহার করে থাকি। এই অর্থ দিয়ে ধারার ঐ বাক্যটি সাজালে যা দাঁড়ায়- “ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী” অর্থ তফসিলে উল্লিখিত বিভিন্ন আদিবাসী যথা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ও শ্রেণীর জনগণ। আদিবাসীকে সুনির্দিষ্টভাবে বুঝানোর জন্য উদাহরণ হিসেবে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী শব্দটাকে ব্যবহার করা হয়েছে। বোধগম্য হচ্ছে কি?
দৈনন্দিন কথাবার্তায় আমরা ‘অর্থাৎ’ এর স্থানে ‘তথা’ বসিয়ে থাকি। এখানে ‘তথা’র স্থলে ‘অর্থাৎ’ বসিয়ে দিলে অর্থ বেশি পরিষ্কার হয়। দেখা যাক- “ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী” অর্থ তফসিলে উল্লিখিত বিভিন্ন আদিবাসী অর্থাৎ ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ও শ্রেণীর জনগণ। এর অর্থ হয়ে যায়- তফসিলে উল্লিখিত আদিবাসী বা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীরাই হল ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী। তফসিলে অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর পাশাপাশি গারো জাতির নামও আছে। অর্থাৎ, এই আইনেই গারোদের বলে দিচ্ছে যে, গারোরা আদিবাসী। আরো সহজ করে বললে যা হবে- গারো আদিবাসী হল ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী। এই আইন প্রথমে আমাদের স্বীকৃতি দিয়ে বলছে, গারোরা আদিবাসী। পরে বলছে তারাই ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী। গারোরা আদিবাসী, আবার গারোরাই ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী। গারোরা আদিবাসীও, গারোরা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীও। এই আইন বলে দেয়নি, গারোরা আদিবাসী না বা গারোরা আদিবাসী পরিচয় দিতে পারবে না কিংবা গারাদের আদিবাসী পরিচয় দেওয়ার ক্ষেত্রে নিষেধ আছে। সুতরাং, এই আইন অনুযায়ী গারোরা নিজেদের আদিবাসী বলতে পারে। প্রকাশ্য অনুষ্ঠানে হোক বা সরকারি কার্যক্রমে। কোন আইনগত সমস্যা নেই।
রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০ এর ৯৭ ধারায় কয়েকটি জাতিগোষ্ঠীর পাশাপাশি গারোকে Aboriginal বলা হয়েছে। বাংলা একাডেমীর ইংলিশ-বাংলা অভিধানে Aboriginal এর বাংলা অর্থ আদিম বা আদিবাসী। অর্থাৎ, ১৯৫০ সালের আইনে আমাদেরকে আদিবাসী বলা হয়েছে। এই আইন এখনও কার্যকর। বাতিল করা হয়নি বা Aboriginal ব্যবহারেও নিষেধাজ্ঞা জারি হয়নি।
কোন বিষয় বেআইনী বা অবৈধ হতে হলে কোন আইনে তা সুনির্দিষ্ট থাকতে হবে। এমন কোন আইন দেশে পাশ করা হয়নি যেখানে বলা আছে যে, দেশে আদিবাসী নেই অথবা আদিবাসী বলা যাবে না। এখন কোন ব্যক্তিত্ব যদি বলে, দেশে আদিবাসী নেই, তাহলে তার কথা উপরে উল্লিখিত দুটি আইনের সাথে সাংঘর্ষিক হবে। এই সংঘর্ষে আইনই সবার ‍উপরে।
সুতরাং, আমরা আদিবাসী পরিচয় দিতে পারি। কেউ যদি আমাদের পরিচয় অন্যভাবে দেয়, সেটা তার ব্যাপার। অন্তত আমরা নিজেদের পরিচয় ঠিকভাবেই দিতে পারি।
লেখক: জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট
Facebook Comments

এক নজরে

মধুপুর বনে বাসন্তীদের হাহাকার-দেশ রুপান্তর

সঞ্জীব দ্রং : রাষ্ট্রযন্ত্র যে তার সাধারণ ও গরিব মানুষের সঙ্গে কী রকম নিষ্ঠুর আচরণ করে, …

error: Content is protected !!