শিরোনাম
প্রথম পাতা / আইন / পাহাড় থেকে আদালত #২

পাহাড় থেকে আদালত #২

মিকরাক ম্রং সোহেল: পালিয়ে বিয়ে করতে গিয়ে কত মেয়েরই জীবনে হাজারো কষ্ট নেমে এসেছে, কে জানে! আমরা এর হিসাব রাখি না। শুধু আদালতে এসে জবানবন্দি দেওয়ার সময় চোখের জল গাল বেয়ে ঝরে পড়লেই বুঝি, মেয়ের উপর দিয়ে কী ঝড়টাই না বয়ে যাচ্ছে! এই ধরনের হাজারো অশ্রুর সাক্ষী হওয়ার জন্যই হয়তোবা এই পেশায় আছি। প্রাত্যহিক অশ্রু দর্শন হলেও কেন জানি এই ঝরনার ধারা দেখলে আবেগ ধরে রাখতে পারি না। ঠিক তেমনই করোনাকালে এক মেয়ের জবানবন্দি আমাকে আবারও আবেগী করে তোলে।

ভার্চুয়াল আদালতের মাধ্যমে জামিন শুনানি শুরু হয় মে মাসের ১২ তারিখ থেকে। ভার্চুয়াল কার্যক্রমের তৃতীয় সপ্তাহের একদিন জিআরও জানালো, এক মেয়ে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন এর ২২ ধারায় জবানবন্দি দিবে। আমি আমার বাসার এক কক্ষে দরজা বন্ধ করে প্রস্তুত হলাম। এরপর মোবাইলে ভিডিও কলিংয়ের মাধ্যমে জিআরও এর সাথে কানেক্টেড হই। মেয়েটিকে স্ক্রীনের সামনে রাখা হল। ছিমছাম-গোছালো মেয়ে। সুশ্রী। শান্ত। বয়সের তুলনায় পরিপক্ব ভাব। আমাকে দেখে মুচকি হেসে মাথা নিচু করলো! আমি অবাক! আদালতে এসে অনেকের জিভে জল থাকে না। হার্টবিট বেড়ে যায়। অনেকে কেঁদেই ফেলে। এমনকি, পুলিশদের মধ্যে যারা নতুন সাক্ষী দিতে আসে, তাদেরও দেখেছি মুখ দিয়ে সহজে কথা বেরোয় না। আর মেয়েটি হাসছে! আমার মাথার চুল ছোট, দেখলে মনে হয় দু-একদিন আগে ন্যাড়া করেছি, এই কারণে? এতে হাসির কী আছে! নাকি গারো বলে? মেয়েটি গারো এলাকার। গারোদের সাথেই স্কুলে পড়ে। এই কারণগুলো হতে পারে না। কৌতুহলবশত আমিও আমার নিজের স্ক্রীনে তাকালাম। কারণ বুঝে আমার মনেও হাসি এলো। তাড়াহুড়া করে আমি এই কক্ষে এসেছি। এখানে আমার ছোট্ট মেয়ের কাপড়-চোপর ঝুলানো। কাপড়গুলো ঠিক আমার মাথার উপরেই, স্ত্রীনে দেখা যাচ্ছে। ভালভাবে না দেখলে মনে হবে, পুরুষদের ভিতরে পড়ার কাপড় মাথায় ঝুলিয়ে আমি এক মেয়ের জবানবন্দি নিচ্ছি!
মেয়েটি এবার এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। ভাল রেজাল্ট। তোমার ভবিষ্যত উজ্জ্বল, এই সময়ে পালাতে গেলে কেন? সে বলল, তার বাবা এই বয়সেই জোর করে আরেকজনের সাথে বিয়ে দিতে চায়। সে না করেছিল, মানেনি। যাকে সে ভালবাসে তার সাথে তাই পালিয়েছে। আমার মুখে আর কোন প্রশ্ন আসলো না। ভাবলাম, মেয়েটির আর কীইবা করার ছিল। এখনও গ্রামীণ সমাজে বিশ্বাস, মেয়ে বড় হয়ে গেলে জামাই পাওয়া যাবে না, টাকা অনেক লাগবে, ডাঙর মেয়ে ঘরে থাকলে কেলেঙ্কারি হবে ইত্যাদি। এই বিশ্বাসই তার বাবাকে চেপে ধরেছিল। ভালবাসা সেই বিশ্বাস থেকে বেড়িয়ে এসেছে! ভালবাসার জয়! ভালবাসার জয় দেখে বাবা কি চুপ থাকতে পারে? করে দিলো অপহরণের মামলা। পুলিশ ধরলো মেয়েটিকে আর তার নববরকে।
আদালতে এই ধরনের মামলা নিয়মিতই আসে। মেয়ে প্রেমিকের হাত ধরে পালিয়ে গেলেই অপহরণের মামলা। পুলিশ ধরে নিয়ে আসবে, মেয়ে বলবে, ‘আমি স্বেচ্ছায় স্বজ্ঞানে এই কাজ করেছি’, প্রেমিক কয়েকদিন হাজত খাটবে। কিছুদিন পর সবাই মিলে যাবে। আবার দেখা যায়, পালিয়ে যাওয়ার পর প্রেমিকা বুঝলো, সে তার প্রেমিকের ২ বা ৩ নাম্বার স্ত্রী হতে চলেছে; কয়েকদিন একসাথে থাকার পর প্রেমিক বিয়ে করতে তাল-বাহানা করছে। কিছুদিন আগে এক হিন্দু মেয়ে তার মুসলিম প্রেমিকের সাথে পালিয়ে বিয়ে করলো। প্রেমিকের ঘরে গিয়ে দেখে, প্রেমিক দুই সন্তানের জনক! হিন্দু মেয়েটি তালাক দিতে চায়। জানতে চাইলাম, হিন্দু মেয়ে তুমি, না ভেবে এই কাজ করেছো, এখন হিন্দু জামাই পাবে কোথায়। বলল, একজন লাইনে আছে! আর কী বলবো! তবে এই মামলার ক্ষেত্রে বাবা-মা’র মেনে নেওয়ার লক্ষণই বেশি।
জিআরও বললো, ‘স্যার, আসামীর (প্রেমিক) জামিনের দরখাস্ত আছে’। আমি জেল হাজতে পাঠাতে বললাম। জানি, এই মামলায় অপহরণের উপাদান নেই। এরপরও জামিন না দেওয়ার একটিই কারণ, এটি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচার্য মামলা। কর্তৃপক্ষ থেকে এই ধরনের মামলায় জামিন দেওয়ার ক্ষেত্রে মৌখিক নিষেধাজ্ঞা আছে। পরবর্তীতে রিভিশনাল আদালত থেকে জামিন নিতে হবে। হাজতে পাঠানোতে মেয়েটির মনোঃকষ্ট হলো। মনে মনে বললাম, তাদের সংসার যেন না ভাঙে। এমন অনেক মামলা দেখেছি, বাবা-মা অপহরণের মামলা করার কারণে ছেলে হাজত খাটলে ক্ষোভে ছেলে তালাক দিয়ে পাঠিয়ে দেয়। ঝামেলায় পড়ে মেয়ে। প্রেমিক হাজত খাটুক বা হাজতের পর তালাক দিক বা বাবা-মা মেনে না নিক, সবক্ষেত্রে মেয়েরই কষ্ট। মেয়ে যদি নাবালিকা হয়, তাহলে মেয়েকে কোথায় বা কার কাছে দেওয়া হবে তা নিয়েও ঝামেলা। মেয়ে যদি বাবা-মার কাছে যেতে না চায়, আর স্বামীও যদি হাজতে থাকে, সে তখন একা হয়ে যায়। একবার কয়েকমাসের এক অন্তসত্তা মেয়েকে নিয়ে সমস্যা হয়েছিল। তাকে গাজীপুর কিশোরী উন্নয়ন কেন্দ্রে রাখা হয়। তার বিশেষ যত্নের প্রয়োজন হওয়ায় বাবা-মা মেয়েকে নিতে চাইলো। অন্যদিকে, স্বামীও আবেদন করে। স্বামী আসামী হওয়ায় স্বামীর জিম্মায় দেওয়া যাবে না। মেয়ে যাবে না বাবা-মার কাছে, তার সন্দেহ, তার বাবা-মা তার গর্ভের সন্তানকে নষ্ট করতে পারে। গর্ভের সন্তানের দোহাই দিয়ে উভয়পক্ষকে সম্পর্ক মেনে নিতে বলেছিলাম, মেয়ের বাবা-মা রাজী হয়নি। আরেকবার এক মেয়েকে মায়ের জিম্মায় দেওয়ার পরই আদালতের চট্টরেই হয়ে গেল হট্টগোল। মেয়ের এক হাত ধরে টানে মা, অন্যহাত ধরে স্বামীর মা। এই ধরনের টানাটানিতে যা হওয়ার মেয়েরই হয়, বাকী সবাই নিজেদের জিদের জয় দেখতে চায়। আর আমরা হলাম মহাসাক্ষী!
এই মেয়ের মতো আরও অনেকের জবানবন্দি নিয়েছি। তবু কেন এই মেয়েকে নিয়ে লিখতে ইচ্ছে হলো জানি না। গত বছর ঈদের সময় এক মেয়ে স্বামীসহ কলমাকান্দা যাচ্ছিল। সদরের এক হোটেলে প্রকৃতির ডাকে সারা দিতে গেলে স্বামীকে বেঁধে রেখে মেয়েটিকে ৮-১০ জন ধর্ষণ করে। সেই মেয়েটির জবানবন্দি নেওয়ার সময়ও আবেগী হয়ে গিয়েছিলাম। এরপর আরো কত ধরনের ঘটনার শিকার মেয়ের সাথে কথা বলেছি হিসেব নেই। তারপরও কেন এই মেয়েকে নিয়ে লিখতে মন চাইলো তা উপরওয়ালাই জানে!

লেখক: জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট

Facebook Comments

এক নজরে

মামলাও চলে একা একা (মানীর মেয়ের কাছে খোলা চিঠি)

মিকরাক ম্রং সোহেল : তোমার কোন বোন নির্যাতনের শিকার হলে আমরা আন্দোলন করি। রাজপথে নামি। কাঁপিয়ে …

error: Content is protected !!