শিরোনাম
প্রথম পাতা / আইন / উইল কী? গারো প্রথায় কি উইল আছে? উইল কিভাবে করতে হয়?

উইল কী? গারো প্রথায় কি উইল আছে? উইল কিভাবে করতে হয়?

মিকরাক ম্রং সোহেল: কোন ব্যক্তি মৃত্যুর আগে দলিলের মাধ্যমে কাউকে সম্পত্তি অর্পণ করলে তাকে উইল বলে। উইল হল এক ধরনের বিবৃতি যেখানে একজন ব্যক্তি তার মৃত্যুর পর তার সম্পত্তি কিভাবে বন্টিত হবে সেটি প্রকাশ করেন। দাতার মৃত্যুর পর উইল কার্যকর হয়। উত্তরাধিকার আইন, ১৯২৫ এর ২(জ) এর বিধানমতে, উইল হল নিজের সম্পত্তি নিয়ে একজন দাতার ইচ্ছার আইনসম্মত ঘোষণা যেখানে তার মৃত্যুর পর তার সম্পত্তি কিভাবে ধারণ করা হবে সেই সম্পর্কে বলা থাকে। দানপত্র ও উইলের মধ্যে মূল পার্থক্য হল- দান করার সাথে সাথেই দানপত্র কার্যকর হয়, আর উইল সাথে সাথে কার্যকর হয় না, দাতার মৃত্যুর পরেই উইল কার্যকর হয়।
গারো প্রথায় উইল: গারো সমাজেও উইলের প্রথা লক্ষ্য করা যায়। ড. জুলিয়াস এল আর মারাক তার গারো কাস্টমারি ল’জ ট্রেডিশানস এ্যান্ড প্র্যাকটিসেস বইয়ে গারো সমাজে উইলের চর্চার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। প্রাচীনকালে আত্মীয়-স্বজন, পরিবারের সদস্য বা চ্রা-মাহারীদের উপস্থিতিতে বাবা-মা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আলোচনার সময় সন্তানদের মধ্যে কিভাবে সম্পত্তি বন্টন হবে সেই বিষয়ে ইচ্ছা প্রকাশ করতেন। মৃত্যুর আগে সেই ইচ্ছা অনুযায়ী তারা সম্পত্তি বন্টন করে যেতে না পারলেও তাদের চ্রা-মাহারী সেই ইচ্ছার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতেন এবং বাবা-মা’র ইচ্ছানুযায়ী সন্তানদের মধ্যে সম্পত্তি বন্টন করতেন। অর্থাৎ, বাবা-মা সম্পত্তির বন্টন নিয়ে মৌখিকভাবে ইচ্ছা পোষণ করলে তাদের মৃত্যুর পর তাদের আত্মীয়-স্বজন তাদের সেই ইচ্ছার বাস্তবায়ন ঘটিয়ে উইল সম্পাদন করতেন। প্রাচীনকালে গারোরা অশিক্ষিত হওয়ায় এবং সমাজের মধ্যে লিখিত রূপের প্রচলন না থাকায় এই ধরনের মৌখিক উইলের প্রচলন ছিল। বর্তমানকালে কেউ উইল করতে চাইলে জটিলতা এড়ানোর জন্য লিখিতভাবে উইল করলেই ভাল হবে। সাক্ষীদের সামনে লিখিতভাবে যেকোন ভাষায় যেকোন কাগজে উইল করতে পারেন।
কে উইল করতে পারে: অর্জিত সম্পত্তির ক্ষেত্রে বাবা-মা দু’জনই উইল করতে পারেন। ঐতিহ্যবাহী মাতৃসম্পত্তির ক্ষেত্রে সাধারণত মেয়েরাই উইল করতে পারে। তবে জবাং ডি. মারাক তার দি গারো ল’ বইয়ে বলেছেন, গারো পুরুষও তার স্ত্রী ও চ্রাদের সম্মতি নিয়ে মাতৃসম্পত্তি উইল করতে পারেন। এক্ষেত্রে আত্মীয়-স্বজনদের নিয়ে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
উইলের নিবন্ধন: বাংলাদেশে নিবন্ধন আইন, ১৯০৮ এর ১৮ নং ধারার বিধান অনুযায়ী উইল নিবন্ধন বাধ্যতামূলক নয়। তবে নিবন্ধন করলে তা সম্পাদনের প্রশ্নে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে কাজ করবে।
প্রবেট (উইলের বৈধতা): আদালত কর্তৃক প্রত্যায়িত উইলকেই প্রবেট বলে। অর্থাৎ, প্রবেট হল উইলের কপি যা আদালত প্রত্যায়ন করেছেন। কোনো ব্যক্তি উইলমূলে কোনো সম্পত্তি পেলে দাতার মৃত্যুর পর তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হয় না। যার অনুকূলে উইল সম্পাদন করা হয়েছে, তিনি ঐ উইল আদালতে দাখিল করে প্রবেট প্রাপ্তির জন্য দরখাস্ত প্রদান করবেন। এর প্রেক্ষিতে আদালত দাতার ওয়ারিশদের ডাকবেন তাদের আপত্তি জানার জন্য। ওয়ারিশদের আপত্তি না থাকলে, অথবা থাকলে সাক্ষ্য-প্রমাণ বিবেচনা করে, আদালত একটি প্রত্যায়নপত্র প্রদান করবেন, সেটিই প্রবেট। এই প্রবেটই উইলের চূড়ান্ত প্রমাণ। প্রবেট প্রাপ্তির পরই কোন ব্যক্তি উইলের সম্পত্তির মালিকানা চূড়ান্তভাবে প্রাপ্ত হবেন। মুসলিমদের জন্য প্রবেট বাধ্যতামূলক নয়। তবে হিন্দু বা খ্রীষ্টানদের জন্য প্রবেট বাধ্যতামূলক। প্রবেট প্রাপ্তির বিষয়ে গারোদের জন্য বা প্রথাগত আইন অনুসরণকারীদের জন্য সুনির্দিষ্ট ভিন্ন আইন বা বিধান নেই। তবে যেহেতু প্রবেট উইলের চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে কাজ করে, সেহেতু গারোরা উইলের প্রবেট নিতে পারেন। প্রবেট প্রাপ্তির পর উইলের বিষয়ে কেউ কোন প্রশ্ন উত্থাপন করতে পারবেন না।
তথ্যসূত্র:
উত্তরাধিকার আইন, ১৯২৫
গারো কাস্টমারি ল’জ ট্রেডিশানস এ্যান্ড প্র্যাকটিসেস
দি গারো ল’
নিবন্ধন আইন, ১৯০৮
এ টেক্সট বুক অন মুসলিম ল’

লেখক: জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট

Facebook Comments

এক নজরে

মামলাও চলে একা একা (মানীর মেয়ের কাছে খোলা চিঠি)

মিকরাক ম্রং সোহেল : তোমার কোন বোন নির্যাতনের শিকার হলে আমরা আন্দোলন করি। রাজপথে নামি। কাঁপিয়ে …

error: Content is protected !!