শিরোনাম
প্রথম পাতা / আদিবাসী / হাজং জাতির চেতনা বিকাশে নহুষ হাজংয়ের অবদান অনস্বীকার্য

হাজং জাতির চেতনা বিকাশে নহুষ হাজংয়ের অবদান অনস্বীকার্য

সোহেল হাজং : শ্রদ্ধেয় নহুষ হাজং আজ আর আমদের মাঝে নেই। করোনাকালের এ দুঃসময়ে তিনি অনেকটা নিরবে বিদায় নিলেন। কিন্তু তাঁর কর্মময় জীবনে যে অবদান হাজং জাতি ও দেশের জন্য রেখে গেলেন তা অনন্তকাল স্বরণীয় হয়ে থাকবে।

হাজং জাতির রয়েছে হাজারো বছরের দীর্ঘ ইতিহাস। সুখ-দুঃখ, সংগ্রাম, সংস্কৃতিতে ভরপুর হাজংদের জীবন। যদিও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও চাকরির প্রতি ঝুঁকে পড়া এ জাতির ইতিহাস বেশি বছরের নয়। আজ থেকে প্রায় ৩ যুগ আগে এই অবহেলিত জাতির শিক্ষার্থীদের সংগঠিত করার চিন্তা যারা করেছেন তাদের মধ্যে একজন অন্যতম ছিলেন নহুষ হাজং। আমরা যেমন জানি, একটি জাতির উন্নয়নে শিক্ষার কোন বিকল্প নেই। ঠিক তেমনি, ছাত্রদের সংগঠিত করা ছাড়া বা তাদের মাঝে নেতৃত্বের বিকাশ ঘটানো ছাড়া জাতি হিসেবে বেশিদূর এগোনো সম্ভব নয়। এই বাস্তব সত্যটুকু সেসময় ধরতে পেরেছিলেন আমাদের পূর্বসূরী নহুষ হাজং, স্বপন হাজংসহ আরো কয়েকজন।

নহুষ হাজং

১৯৭৭ সালের ১১ নভেম্বর ‘বাংলাদেশ হাজং কল্যাণ সমিতি’ নামে দেশে প্রথম একটি জাতীয় সংগঠনের উদ্ভব ঘটে। পরবর্তীতে, এর নামকরণ করা হয় ‘বাংলাদেশ হাজং উন্নয়ন সংগঠন’ এবং বর্তমানে এটিই ‘বাংলাদেশ জাতীয় হাজং সংগঠন’ নামে এখনো টিকে আছে। আমরা দেখেছি, বিভিন্ন কারণে এসব অবহেলিত জাতিগোষ্ঠীর সংগঠনের কার্যক্রম- হয় ধীর গতিতে চলে, নাহয় ঝিমিয়ে পড়ে। কিন্তু ছাত্ররাই এসব সংগঠনের দুর্বলতাগুলো ধরতে পারে এবং সংগঠনকে সক্রিয় গড়ার জোরালো পদক্ষেপ নেয়। হাজং জাতীয় সংগঠনেরও এরকম অবস্থার সম্মুখীন হতে হয়েছে বহুবার। সংগঠনের এরকম ঝিমিয়ে পড়া এক অবস্থায় ১৯৮৪ সালের দিকে স্বপন হাজং, নহুষ হাজং, ফরিদ হাজং, নিলীমা হাজং প্রমুখ জেগে ওঠেছিলেন। যার পরিপ্রেক্ষিতে, তারা একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার আয়োজন করে ১৯৮৪ সালের ২৮ অক্টোবরে দুর্গাপুর ললিত বিপিন হাজং ছাত্রাবাসে। আলোচনার শিরোনাম ছিল “হাজং জাতীয় সম্মেলনের গুরুত্ব এবং ছাত্র ও যুব সমাজ সমাজের জন্য কি দায়িত্ব পালন করতে পারে?” (খগেন্দ্র হাজং, হারকন ২০১৮)। উক্ত আলোচনায় জাতীয় হাজং সংগঠনের নেতৃবৃন্দসহ হাজং ছাত্র-যুবরা গুরুত্ব দিয়ে অংশগ্রহণ করেন এবং সেখানে জাতীয় সংগঠনকে আরো সক্রিয় ভূমিকা নিতে দাবি জানানো হয়।

হাজং ছাত্রদের সেই নেতৃত্বের ধারাবাহিকতার ফল আমরা দেখি ১৯৮৮ সালে বাংলাদেশ হাজং ছাত্র সংগঠনের প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। যে সংগঠনের প্রথম ও প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন শ্রী নহুষ হাজং। তাঁর এই একটি অবদানের জন্য হাজং জাতির বিকাশ ও নেতৃত্বের ইতিহাসে নহুষ হাজংয়ের নাম স্বর্ণাক্ষরে লিখা থাকবে। এরপর আমরা তাঁকে ২০০৪-২০১১ সালে হাজংদের জাতীয় প্লাটফর্ম “বাংলাদেশ হাজং উন্নয়ন সংগঠন”-এর সভাপতি হিসেবে নেতৃত্ব দিতে দেখেছি। হাজং ছাত্র সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এবং হাজং উন্নয়ন সংগঠনের সভাপতি হিসেবে তিনি জাতির বিকাশ ও উন্নয়নে বিভিন্ন অবদান রেখেছিলেন।

নহুষ হাজংয়ের সাথে আমার ব্যক্তিগত পরিচয় ২০০৩ সাল থেকে যখন আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে সাংগঠনিক কাজে সংযুক্ত হওয়ার চেষ্টা করি। এটাও বলা যায় যে, সাংগঠনিক কাজে জড়িয়ে পড়ার আমার জীবনে অন্যতম একজন অনুপ্রেরণা দানকারী ছিলেন তিনি। তাঁকে আমি মামা বলে ডাকতাম। নহুষ মামার চমৎকার বোঝানোর ক্ষমতা, জাতির প্রতি প্রেম ও জাতীয়তাবোধ আমাকে অসম্ভবভাবে  ভেতরটা জাগিয়ে তোলে। শুধু পড়াশুনায় একমাত্র লক্ষ্য নয়, এ অবহেলিত জাতিকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য অনেক দায়িত্ব আমাদের রয়েছে। নহুষ মামার মাধ্যমে এ বিষয়টি আরো পরিস্কার হয়। তিনি কখনো হারতে চাইতেন না। সদা হাস্যোজ্জ্বল অন্যরকম এক ভালো মানুষ ছিলেন তিনি।  শতবাধা ও দুর্বলতার মাঝেও তিনি আশার আলো দেখতেন। হাসিমুখে সবকিছু মেনে নিয়ে সমস্যা সমাধানের অসম্ভব শক্তি ধারণ করে চলতেন তিনি। তাঁকে দেখেছি নিজের কাজ ছেড়ে জাতি ও সংগঠনের কাজে এদিক সেদিক ছুটোছুটি করে সময় দিতেন। তিনি সেসময় হাজংদের আন্দোলন ও কুমুদিনী হাজংকে দেশের বিভিন্ন পর্যায়ে তোলে ধরতেও চেষ্টা করেছেন। ঢাকার বড় বড় অনুষ্ঠানে কুমুদিনী হাজংকে নিয়ে প্রায়ই হাজির হতেন নহুষ মামা।

২০০৪ সালের ৪ মার্চ বাংলাদেশ হাজং উন্নয়ন সংগঠনের জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই জাতীয় সংগঠনের সভাপতি পদে নির্বাচিত হলে নহুষ হাজংয়ের মাঝে জাতি নিয়ে কর্মতৎপরতা আরো বেড়ে যায়। স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে তিনি হাজংদের অবস্থা তোলে ধরার চেষ্টা করেন। কিন্তু জাতীয় সংগঠনে তাঁর নেতৃত্বের ২-৩ বছর যেতে না যেতেই হঠাৎকরে সাংগঠনিক কর্মকান্ডে তাঁর জোরালো ভূমিকার অনুপস্থিতি লক্ষ্য করি। এর পেছনে বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। যার মধ্যে মনে করতে পারি ১. হাজং উন্নয়ন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক সত্যবান হাজং ২০০৬ সালের ২৩ এপ্রিল নির্মমভাবে দুষ্কৃতকারী দ্বারা খুন হন। আরেকটি কারণ হতে পারে ২. তাঁর পারিবারিক ও পেশাগত জীবনে বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়া।  একদিকে সাধারণ সম্পাদক হত্যার শিকার অন্যদিকে সভাপতির জোরালো পদক্ষেপ ও তৎপরতার অভাবে বাংলাদেশ হাজং উন্নয়ন সংগঠনের দিন সেসময় ভালো যায়নি। পরবর্তীতে ছাত্র-যুবরাই আবার জাতীয় সংগঠনের এ খারাপ অবস্থা চিহ্নিত করে জাতির হাল ধরতে কার্যকর পদেক্ষেপ নেওয়ার আহবান জানায়। ৭ নভেম্বর ২০১১ দুর্গাপুর হাজংমাতা রাশিমণি কল্যাণ পরিষদ অফিসে আশীষ কুমার হাজং ও আমি একটি জরুরি সভা আহবান করি। যেখানে সে সময়ের প্রেক্ষাপটে আমি ‘কিংকৗকে হুব (কেমন হবে)’ শীর্ষক একটি প্রবন্ধ তোলে ধরি। এরপর খগেন্দ্র হাজংকে (স্বর্গীয়) আহ্বায়ক ও পল্টন হাজংকে সদস্যসচিব করে ঐদিনই জাতীয় হাজং সম্মেলন প্রস্তুতির একটি কমিটি করা হয়। যার ফলে, ২০১২ সালের ২ মার্চ বিরিশিরিতে অনুষ্ঠিত হাজং সম্মেলনে “বাংলাদেশ হাজং উন্নয়ন সংগঠন” রূপ নেয় “বাংলাদেশ জাতীয় হাজং সংগঠন” নামে।

গত প্রায় এক দশকে নহুষ মামার সাথে আমার সরাসরি দেখা হয়নি। তবে প্রায়ই খবর নিতাম, তিনি কোথায় আছেন, কেমন আছেন। বন কর্মকর্তার চাকরি নিয়ে তিনি দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পেশাগত দায়িত্ব পালন করেছেন। মৌলভীবাজারে তাঁর পোস্টিং থাকাকালে আমি বলেছিলাম আমার এক বান্ধবী সেখানে একটি আন্তর্জাতিক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছে। একটু সময় পেলে দেখা করে আসুন। মামা গিয়ে দেখা করেছেন এবং আমাকে তা জানিয়েছেন। ২০১১ সালে সরকারি চাকরিতে আমি তখন কুড়িগ্রামে, একদিন নহুষ মামা আমার গ্রামের বাড়ি বেড়াতে যান। আমার বাবা-মার সামনে থেকে তিনি আমাকে ফোন দিয়ে কুশলাদি জানান। যোগাযোগ বলতে এভাবেই আমাদের কথা হত। পেশাগত কাজে ব্যস্ততার মাঝেও দেখেছি সাংগঠনিক বা ছাত্র সংগঠনের কোন কোন অনুষ্ঠানে তিনি সময় পেলেই হাজির হয়ে যেতেন।

এরপর গত কয়েক বছরে নহুষ মামার সাথে আর কোন যোগাযোগ নেই। ২০২০ সালের করোনাকালের এই মহামারি সময়ে হঠাৎ শুনি তিনি কক্সবাজারের একটি হাসপাতালে ভর্তি আছেন। পেশাগত কারণেই তিনি কক্সবাজারে অবস্থান করছিলেন। শরীরে গোপনে রোগকে অনেক বেশি প্রশয় দিয়ে একেবারে শেষ সময়ে তিনি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন শুনেছি। হাসপাতালে থাকা অবস্থায় তাঁর করোনা নেগেটিভ এসেছিল। তবে তাঁর শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যা বেড়ে গেলে ২৮ জুন সময় রাত ২টা ৩০ মিনিটে কক্সবাজার জেলার চকোরিয়া মেমোরিয়াল হাসপাতালেই মৃত্যুবরণ করেন। হাজং জাতির এক অন্যতম পথপ্রদর্শক ও কান্ডারি নহুষ হাজং এভাবেই আমাদের কাছ থেকে দূরে চলে গেলেন। তবে, শ্রদ্ধেয় নহুষ হাজং আমাদের যে পথ দেখিয়ে গেলেন, আশা করি, হাজং জাতি তাঁর এ অবদানের কথা কখনো ভুলবে না। তাঁর প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা!

সোহেল হাজং

সাংগঠনিক সম্পাদক,

বাংলাদেশ জাতীয় হাজং সংগঠন।

Facebook Comments

এক নজরে

ময়মনসিংহে সংবাদ সম্মেলনে ১১ দফা বাস্তবায়নের দাবি

আচিক নিউজ ডেস্ক: আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উদযাপন উপলক্ষে ১১ দফা বাস্তবায়নের দাবিতে ময়মনসিংহে সংবাদ সম্মেলন …

error: Content is protected !!