প্রথম পাতা / মতামত / পাহাড় থেকে আদালত – ৬

পাহাড় থেকে আদালত – ৬

মিকরাক ম্রং সোহেল: জেলখানায় আমরা। মহিলা সেকশনে। সাথে তুষি, নুসরাত, সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট শাহাদাত হোসেন স্যার ও জেল সুপার। আমাদের নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য আরও কয়েকজন কারারক্ষী পাশে। জেল সুপারের ইঙ্গিতে এক নারী কয়েদি গান গাওয়া শুরু করলো। কী সুমধুর কণ্ঠ আর চমৎকার সুর! আবেগ নিংড়ে গাওয়া গান! কান দিয়ে শুনছি আর অন্য নারী আসামীদের দিকে তাকাচ্ছি। কক্ষটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। নারী কয়েদি মোট ৫-৬ জন। একটি কক্ষে সবাই। তাদের দায়িত্বে নারী কারারক্ষী। এই সেকশন তালাবদ্ধ থাকে সবসময়। জেলখানার ভিতরে অন্য সেকশন থেকে এখানে আসার সুযোগ নেই, আবার এখান থেকে অন্য সেকশনে যাওয়ারও সুযোগ নেই। গান শোনার এক পর্যায়ে কেমনভাবে জানি আবেগী হয়ে গেলাম। ভাবছি, শিল্পী মহিলাটি নিশ্চয়ই পেশাদার অপরাধী নয়। কোন এক বিরূপ পরিস্থিতিতে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে অপরাধ করে বসেছে। মেয়েটির সাথে ছোট এক দুগ্ধ বাচ্চা। জেলখানাতেই বড় হচ্ছে। বোধক্ষমতা আসার আগেই বাচ্চাটি কারাগারে! কোন অপরাধ না করেই কাটাচ্ছে বন্দীজীবন। একদিন সে এখান থেকে চলে যাবে। স্বাধীন জীবন গড়বে। তখন কি তার এই জেলখানার জীবন মনে পড়বে! নিরীহ মনে আমিও যে তার দিকে অপলক তাকিয়ে ছিলাম- বাচ্চাটি এটিও মনে করতে পারবে না! এসব ভাবছি আর তখনই গান শেষ। এরপর জেলা সুপার দেখালেন সেলাই মেশিন। মহিলা কয়েদিদের জন্য তিনি সেলাই মেশিন কিনে দিয়েছেন। তারা সেলাইয়ের কাজও শিখতে পারে, আবার আয়ও করতে পারে। বন্দীজীবন সমাপ্ত হলে তারা সেই টাকা নিয়ে বাইরে কিছু একটা করে খেতে পারবে।

সেদিন আমরা অন্য সেকশনও ঘুরে দেখেছি। কিশোরগঞ্জের পুরাতন এই কারাগারটি খুব বেশি বড় নয়। মহিলা সেকশন বাদে অন্য সেকশনে কয়েদি গাদাগাদি। সবাইকে জেল সুপার কাজে লাগিয়েছে। কেউ সবজি চাষ করে, কেউ রান্না করে, কেউবা অক্ষরজ্ঞানহীনদের পড়াশুনার ভার নিয়েছে। কেটে যাচ্ছে তাদের জীবন। আমরা অবশ্য তাদের জীবন দেখার জন্য সেখানে যাইনি। টিআই প্যারেডের জন্য গিয়েছিলাম। ঐ সময় আমরা শাহাদাত স্যারের সাথে প্রশিক্ষণের জন্য সংযুক্ত। তিনিই আমাদেরকে নিয়ে গেছেন। টিআই প্যারেড মূলত কয়েকজনের মধ্য থেকে অপরাধী সনাক্ত করার প্রক্রিয়া। আমাদের সমানেই এই প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয়। ডাকাতের মামলায় কয়েকজন সন্দেহভাজন আসামীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা আসলেই ডাকাতের সময় ছিল কিনা তা নিশ্চিত করার জন্য অন্য নয়জন কয়েদির সাথে গ্রেপ্তারকৃত সন্দেহভাজনক ব্যক্তিকে একই লাইনে রাখা হয়। এরপর ডাকাতীর সময় যে সাক্ষীরা দেখেছে তাদের একজন একজন করে ডেকে সেই দশজনের মধ্যে অপরাধী সনাক্ত করতে বলা হয়। সাক্ষীরা একজন একজন করে এসে অপরাধী সনাক্ত করে যায়।
এরপর ২০১৭ সালে আবার কারাগার পরিদর্শনের জন্য যাই। তবে এবার কিশোরগঞ্জে নয়, বুনিয়াদী প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে কাশিমপুর কারাগারে। বৈঠকখানায় আমাদের আসনের ব্যবস্থা ছিল। আমরা বসলাম, সামনে কয়েদিরা আমাদেরকে অভ্যর্থনা জানাতে প্রস্তুত। শুরু হল গান-
জন্ম থেকে জ্বলছি, মাগো
আর কতদিন বল সইবো
এবার আদেশ করো, তুমি আদেশ করো
ভাঙনের খেলা খেলবো’
সৈয়দ আব্দুল হাদীর বিখ্যাত গান। এই গান আগেও শুনেছি। কিন্তু, গানটির প্রতি এতো টান আগে অনুভব করিনি। এমনকি, এত মনোযোগ দিয়ে এই গান শুনিওনি। গানটি শোনার পর মনের মধ্যে কী যেন আঘাত দিয়ে গেল! কিসের আঘাত বুঝতে পারিনি। যে কয়েদি গানটি গায়ছিল, তার প্রতি অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকলাম। সে হারমনি বাজিয়ে গাইছে। তার পাশে অন্য কয়েদিরা তবলা, জিপসি, জুরি বাজাচ্ছে। তারা হয়তো বিভিন্ন পেশার। এখানে করো বন্ধু হয়েছে, কারো সহকর্মী। কেউ পেয়েছে সহশিল্পী! তাদের মধ্যেই আমাদের সামনে গানের দল। আর গানের দর্শক প্রায় ৪৫ জন বিচারক। গানের মাধ্যমে আমাদের কাছে কোন আরজি জানায় কিনা ভাবলাম একবার। হয়তো জানায়, হয়তোবা জানায় না! আমরা বিচারকরা তা দেখে ক্ষণিকের জন্য হয়তো নিস্তব্ধ হয়ে যাই। এ পর্যন্তই! যে বৈঠকখানায় আমরা বসে আছি, এখানে বিচার হয়। কারাগারের ভিতরে কয়েদিদের জন্য রয়েছে অনেক নিয়ম। আরেক কয়েদির সাথে তার আচরণ কেমন হবে, রক্ষীদের সাথে কিভাবে কথা বলবে, কার কী কাজ, কোন ঘন্টার বা কোন বাঁশির সময় কী করতে হবে, কখন কোথায় থাকতে হবে- এরকম বিভিন্ন নিয়ম তাদের মানতে হয়। কেউ কোন নিয়ম ভঙ্গ করলে এই বৈঠকখানায় এসে বিচারের সম্মুখীন হতে হবে। এখান থেকেই শাস্তিও দেওয়া হয়। স্বাগতমের পর আরম্ভ হল বিভিন্ন শাখা পরিদর্শন।
কাশিমপুর জেলখানা বিশাল এলাকা নিয়ে নির্মিত। বাইরের সীমার মধ্যে গাছ-গাছালি, মাঠ, গরু, হাস, পুকুর সব আছে। জেলারদের কোয়ার্টারও এর মধ্যে। এর ভিতরেই বাউন্ডারী ওয়াল দিয়ে কয়েদিদের নির্দিষ্ট এলাকা। জায়গা বেশি হওয়ার কারণে এখানে কয়েদিদের সংখ্যাও বেশি। অন্যদিকে, কর্মক্ষেত্রও তৈরি করা সম্ভব হয়েছে। তাঁতশিল্প ও হস্তশিল্প দেখে খুব অবাক হয়েছিলাম। অনেক কয়েদি কাজ করে। সুন্দর কাপড়-চোপর ও পন্য তৈরি হয় এখানে। তাদের তৈরি করা একটি পার্স আমি কিনেছিলাম। অন্য বিচারকরাও বিভিন্ন জিনিসপত্র কিনেছে। এখানে প্রেসও রয়েছে। কয়েকজনের সাথে কথা বলেছি। বিডিআর বিদ্রোহের আসামী ছিল তাদের মধ্যে বেশি সংখ্যায়। কেউ হত্যা মামলার, কেউ ধর্ষণের। তাদের ব্যস্ত জীবন দেখলে মনে হবে, তারা কত সুখেই দিন পার করছে। কিন্তু, প্রকৃতপক্ষে তা নয়। তাদের বাড়িতে বৃদ্ধ বাবা-মা এর কে দেখাশুনা করে, তাদের স্ত্রী-সন্তানকে কে খাওয়ায়, তাদের বোনদের বিয়ে হয়েছে কিনা- এইসব চিন্তা তাদের মাথাতেও ঘুরে। তাদের কারণে তাদের আপনজন কষ্ট পাচ্ছে এটি তারাও জানে!
একসময় আমরা কনডেম সেলে। মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আসামীরা ফাঁসির অপেক্ষায় এখানে থাকে। ছোট ছোট কক্ষে একজন করে আছে। দু’একজনের সাথে কথাও বললাম। এরপর ফাঁসির স্থান দেখানো হল। ফাঁসি দেওয়ার প্রক্রিয়াও আমরা জেনে নিলাম। মঞ্চটি উচু। মঞ্চে নিয়ে গলায় দড়ি বেধে পায়ের কাঠ সরিয়ে দেওয়া হয়। তখন ঐ ব্যক্তি মঞ্চের নিচে পড়ে যায়। তার যন্ত্রণা কারও দেখার সুযোগ নেই। কিছুক্ষণ পর মাটির সাথে থাকা মঞ্চের ভিতরের দরজা খুলে দেহ বের করে তার জীবন পরীক্ষা করা হয়।
পরিদর্শন শেষ। কিন্তু, গানের কথা ভুলতে পারিনি। এখনও গুনগুনিয়ে গাই। এই গান কী কারণে মুখে লেগে আছে, জানি না!
নেত্রকোণার কারাগারেও কয়েকবার গিয়েছি। একবার জেলা জজ স্যার সকল বিচারকের পরিবারসহ পরিদর্শনে গেলেন। সেই কথা না হয় আরেকদিন বলা যাবে।
নেত্রকোনা, ২২ জুন ২০২০

লেখক: জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট

Facebook Comments

এক নজরে

একজন গারো কিভাবে তার স্বামী বা স্ত্রীকে ডিভোর্স দিতে পারে?

মিকরাক ম্রং সোহেল: খ্রীষ্ট ধর্ম গ্রহণের পূর্বে গারোরা প্রথা অনুযায়ী বিয়ে করতো। বিয়ে বিচ্ছেদও করা …

error: Content is protected !!