প্রথম পাতা / মতামত / পাহাড় থেকে আদালত – ৪

পাহাড় থেকে আদালত – ৪

মিকরাক ম্রং সোহেল : মহামান্য রাষ্ট্রপতির সামনাসামনি বসে আছি। তাঁর গ্রামের বাড়িতে। কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলার কামালপুরে। স্বপ্নের মতো ব্যাপার। সম্ভব হয়েছে শুধু জেলা জজ স্যারের কারণে।

২০১৬ সালের জানুয়ারি মাস। তখনও কনকনে শীত। স্যার আগেরদিন সংবাদ দিয়ে বলে রেখেছিলেন মিঠামইন যেতে হবে, যেন সকালে প্রস্তুত থাকি। মহামান্য এসেছেন। এলাকার প্রতি হৃদয়ের আলাদা টান থাকায় প্রায়ই তিনি আসেন। তবে গ্রামেই বেশি, কিশোরগঞ্জ শহরে কম। তাঁর আগমণ ঘটলে রাস্তাঘাট বন্ধ হয়ে যায়, জনসাধারণের স্বাভাবিক চলাফেরায় বিঘ্ন ঘটে। এই কারণে গ্রামেই তাঁর পদচারণা হয় বেশি। গ্রামে এসে লুঙ্গি কোমরে গুঁজে হাওড় ঘুরেন। মানুষের সাথে বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে কথা বলেন।
তাঁর সাথে জেলা জজ স্যারের সম্পর্ক ভাল। প্রায় প্রত্যেকদিনই কথা হয়। স্যারের বাড়ি নেত্রকোণা হলেও গুরুদয়াল কলেজে পড়াশুনা করেছেন। মহামান্যও সেই প্রতিষ্ঠানের ছাত্র। আবার দুজনেই মুক্তিযোদ্ধা। এবারও হয়তো জেলা জজ স্যার দেখা করতে যাবেন। কিন্তু, আমার চেয়ে অনেক সিনিয়র কর্মস্থলে আছে। তাঁদেরকে সাথে না নিয়ে শুধু আমাকে কেন? বুঝলাম না। যা হোক, সফরসঙ্গী হতে হবে। আর কোন কথা নয়।
কিশোরগঞ্জ থেকে স্যারের অফিসিয়াল প্রাইভেট কারে রওনা হয়ে চামড়াঘাট পর্যন্ত, এরপর স্পীডবোটে হাওড় পার। স্পীডবোটে এসপি, এডিসি (রেভেন্যু) এবং কয়েকজন পুলিশ সদস্যও ছিলেন। শীতের সকালে স্পীডবোটে হাওড় ভ্রমণ অন্যরকম অনুভূতি, ব্যতিক্রমী অভিজ্ঞতা। দুই পাশে কিনারা, সেখানে কৃষকের গরু নিয়ে বিচরণ। গরু আর হাওড় নিয়েই তাদের জীবন। কিসের শীত, কীই বা ঠাণ্ডা! জীবন তাদেরকে শীত-ঠাণ্ডায় থেমে থাকতে সুযোগ দেয়নি। প্রায় ঘন্টাখানেক পর আমরা কামালপুরে মহানান্য’র বাড়ির সামনে উপস্থিত। যেরকম বাড়ি দেখার জন্য আশা করেছিলাম, সেরকম নয়। খুবই সাদামাটা। হাওড়ের সাথেই। তবে বাড়ির সাথে মসজিদ আছে। মসজিদটিকে তৈরি করা হয়েছে ভাল করেই। চারিদিকে নিরাপত্তা বেষ্টনী। গ্রামীণ এই সাদামাটা পরিবেশে এই রকম নিñিদ্র ব্যবস্থা বেমানান। কিন্তু, দেশ প্রধান তো। থাকতেই হবে। চেকিংয়ের পর ভিতরে প্রবেশ করলাম। যে কক্ষে মহামান্য বসেছেন, সেই কক্ষে প্রথমে জেলা জজ স্যার ঢুকলেন। কিছুক্ষণ পর একজন এসএসএফ আমাকে ডেকে নিলেন। কক্ষে যাওয়ার পরই স্যার আমার নাম ও পদবি বলে মহামান্যকে পরিচয় দিলেন। আমি বসলাম মহামান্য রাষ্ট্রপতি মোঃ আব্দুল হামিদের সামনে। তিনি আমাদের নিয়োগকর্তা। তিনি দেশপ্রধান।
মহামান্য আমার বাড়ি জিজ্ঞেস করলেন। বললাম, শেরপুর। শেরপুর শোনার পরই মতিয়া চৌধুরীর গল্প শুরু। আমি জানতাম, মতিয়া চৌধুরী একজন লৌহ মানবী, ভেঙে পড়েন না, হার মানেন না। কিন্তু, মহামান্য শোনালেন অন্য গল্প। রাজপথে না খেয়ে-দেয়ে, এমনকি, প্রকৃতির ডাককে পাত্তা না দিয়ে তিনি দিনাধিক আন্দোলন করতে পারদর্শী। প্রকৃতি যাকে ডেকে ব্যর্থ হয়, সে অবশ্যই মহামানবই হবে, বলার অপেক্ষা রাখে না! এই গল্পের মাঝখানেই একজন এসএসএফ এসে মহামান্য’র কানে কী যেন ফিসফিস করে বলল। মহামান্য বলে উঠলেন, ‘আহ, তোমরা আমার চুলকেও শান্তিতে থাকতে দিবানা!’ মহামান্য গায়ে চাদর জড়িয়ে ছিলেন। মুখটা বাইরে রেখে মাথা ঢাকা ছিল। কপালের উপর দিয়ে কিছু চুল এলোমেলোভাবে বের হওয়াতেই এসএসএফ এর সহ্য হয়নি। রাষ্ট্রপ্রধান হয়েও নিজের স্বাধীনমত চলতে পারেন না। এসএসএফ এর কথায় চলতে চলতে তাঁর স্বাভাবিক জীবনে সামান্য ছন্দপতন হচ্ছে, বুঝতে দেরি হয়নি। সেখান থেকে বের হয়ে আশেপাশে ঘুরলাম। খাওয়া-দাওয়া হল সেখানেই। স্যার আগেই বলেছিলেন, খাওয়ার সময় দুই-একটা আইটেম দেওয়ার পর আর দেওয়া হবে না ভাবলে ভুল হবে। তা মনে রেখেই প্রতিটা আইটেম অল্প করে খাওয়া আরম্ভ করি। কিন্তু আইটেম শেষ হয় না। আমার পেটতো আর কাওরান বাজারের আড়ত নয়, যে সব ধারন করতে পারবে! রেখে দিতে হলো।
এক সময় বিদায়ের সময় হাজির। মহামান্য হেলিকপ্টারে ঢাকা যাবেন। তাঁকে বিদায় দিয়ে আমরাও ফিরবো। আমরা সবাই হেলিপ্যাডের সামনে দাড়িয়ে আছি। হেলিপ্যাডের সামনে রাস্তায় দুই পাশে প্রচুর মানুষ দাড়িয়ে আছে। আমিও এই জনারণ্যের মধ্যে একজন। আমার পাশে জেলা জজ স্যার। সবার সাথে হ্যান্ডশেক করতে করতে মহামান্য এগোচ্ছেন হেলিকপ্টারের দিকে। আমার কাছে আসলে আমিও করমর্দন করি। তখনই স্যার এক কাণ্ড করে বসলেন। স্যার আমাকে বললেন মহামান্য’র পাশে দাঁড়াতে। মহামান্যকে বললেন, আমি তাঁর সাথে ছবি তুলতে চাই! এই দিকে এসএসএফরা অস্থির। যদি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়! যদি আমার মতো সবাই ছবি তুলতে চায়, তখন কিভাবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে! দিনের কোন এক সময় স্যারকে বলেছিলাম, মহামান্য’র সাথে একটি স্মৃতি রেখে দিতে পারলে ভাল লাগতো। কিন্তু এভাবে এই সময় তিনি তাঁর মোবাইলেই মহামান্য’র সাথে আমার ছবি তুলতে চাইবেন, আমি কল্পনাও করতে পারিনি। জনসমারোহে এসএসএফ এর নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে মহামান্যকে দাঁড় করিয়ে স্যার তাঁর মোবাইলে আমার ও মহামান্য’র ছবি তুললেন। সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকল! এরপর মহামান্য আমাকে অতিক্রম করে পা বাড়ালেন স্যারের দিকে। ঐ সময় ঘটল আরেকটি কাণ্ড! স্যার ধপ করে নিচে পড়ে গেলেন। আমরা সবাই অবাক! স্যারের কী হল! দেখি, স্যারের কিছু হয়নি। স্যার নিচু হয়ে মহামান্য’র পা ছুয়ে সালাম করছেন! এসএসএফ এর অস্থিরতা দেখে ভাবলাম, সবাই যদি পা ছুয়ে সালাম করতে চায় তাহলে কী হবে!
আমি মিঠামইন উপজেলার দেওয়ানী আদালতের দায়িত্বে অনেকদিন ছিলাম। কিন্তু কোনদিনই কোন দিক থেকে মহামান্য’র নামে কোন ফোন বা তদবির আসেনি। এই সময়ের পর আরও কয়েকবার তাঁর সাথে দেখা হয়েছিল। বঙ্গভবনে ও জেলা জজ আদালতে। এখানে প্র্যাকটিস করার সময় তিনি যে স্মৃতিগুলো রেখে গিয়েছিলেন, সেগুলো রোমন্থনের জন্য আদালত ও বার ভবন ঘুরেছিলেন একবার। তাঁর মুখে গ্রাম্য সুরে ভাষা খুব সহজেই মানুষকে আকষর্ণ করতে সক্ষম। তাঁর সাথে কথা বললে মনে হয়, তিনি আমাদের এলাকারই একজন।

লেখক: জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট

Facebook Comments

এক নজরে

পাহাড় থেকে আদালত – ৬

মিকরাক ম্রং সোহেল: জেলখানায় আমরা। মহিলা সেকশনে। সাথে তুষি, নুসরাত, সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট শাহাদাত হোসেন স্যার …

error: Content is protected !!