প্রথম পাতা / আদিবাসী / পার্বত্য চট্টগ্রামের মানবাধিকার পরিস্থিতি প্রতিবেদন

পার্বত্য চট্টগ্রামের মানবাধিকার পরিস্থিতি প্রতিবেদন

আচিক নিউজ ডেস্ক :  কোভিড-১৯ করোনা ভাইরাস মোকাবেলায় সারাদেশের ন্যায় পার্বত্য চট্টগ্রামেও লকডাউনের কারণে জনজীবন যেখানে অচলাবস্থার মধ্যে পড়েছে এবং অর্থনৈতিক জীবন ও জীবিকা যেখানে কঠিন এক বাস্তবতা অতিক্রম করছে, সেখানে এই সময়েও বাংলাদেশ সরকার ও রাষ্ট্রীয় বাহিনী কর্তৃক আদিবাসী জুম্ম জনগণের উপর দমন, পীড়ন, নিয়ন্ত্রণ, নির্যাতন এবং পার্বত্য চুক্তি বিরোধী ও জুম্ম স্বার্থ পরিপন্থী ষড়যন্ত্র থেমে নেই। বরং এই কোভিড-১৯ মোকাবেলায় সৃষ্ট বাস্তবতার আড়ালে
সরকার ও রাষ্ট্রীয় বাহিনী কর্তৃক পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক ষড়যন্ত্র এবং চুক্তি বাস্তবায়নের দাবিতে সোচ্চার অধিকারকর্মীদের অপরাধী হিসেবে পরিচিহ্নিত করার অপচেষ্টা ক্রমাগত জোরদার হয়ে চলেছে ।

সরকার ও রাষ্ট্রীয় বাহিনী একদিকে রাষ্ট্রযন্ত্র ও প্রশাসনিক ক্ষমতাকে অপব্যবহার করে পার্বত্য চুক্তি বিরোধী ও জুম্ম জাতীয় অস্তিত্ব পরিপন্থী নানা কর্মকান্ড ও নীলনকশা বাস্তবায়ন করে চলেছে, অপরদিকে তাদের সৃষ্ট ও মদদপুষ্ঠ সংস্কারপন্থী ও গণতান্ত্রিক-ইউপিডিএফকে দিয়ে পরিস্থিতিকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। বস্তুত চুক্তি-পূর্ব সময়ের মতই পার্বত্য চট্টগ্রামে নিবিড় সামরিক শাসনসহ বিস্ফোরন্মুখ এক যুদ্ধপরিস্থিতি সৃষ্টি এবং জুম্মদের জাতিগতভাবে নির্মূলীকরণের আয়োজন পাকাপোক্ত করা হয়েছে। এখানে একদিকে রাষ্ট্রীয় বাহিনী কর্তৃক এবং অপরদিকে তাদের ভাড়াতে সশস্ত্র গোষ্ঠী সংস্কারপন্থী ও গণতান্ত্রিক-ইউপিডিএফ কর্তৃক হত্যা, মামলা, গ্রেফতার, তল্লাসী, হুমকিসহ মানবাধিকার লংঘন, যখন তখন, যত্রতত্র সামরিক অভিযান ও হামলা ইত্যাদি নিত্যনৈমিত্তিক হয়ে দেখা দিয়েছে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার, মানবাধিকার এবং পার্বত্য চুক্তির আলোকে স্বীকৃত অধিকারকে পদদলিত করে সেনাশাসন ‘অপারেশন উত্তোরণ’ এর বদৌলতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীসহ গোয়েন্দা ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী তথা সামরিক প্রশাসন পূর্বের মতই পার্বত্য চট্টগ্রামে সামরিক অভিযান পরিচালনা করে প্রতিনিয়ত দমন, পীড়ন, হয়রানি, নির্যাতন, ধর্মীয় পরিহানি, তল্লাসী, বাড়ি ঘেরাও, আটক, গ্রেফতার, হত্যা ইত্যাদি চালিয়ে যাচ্ছে। বস্তুত পার্বত্য চুক্তির বাস্তবায়নকে নস্যাৎ করা ও জুম্ম জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকে ধুলিস্যাৎ করা, সর্বোপরি জুম্ম জনগণকে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে জাতিগতভাবে নির্মূলীকরণের হীন উদ্দেশ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামে নিয়োজিত এসকল রাষ্ট্রীয় বাহিনী চুক্তি বাস্তবায়নের দাবিতে সোচ্চার পিসিজেএসএস’র নেতা-কর্মী ও সমর্থক জনগণকে ‘সন্ত্রাসী’ ও ‘চাঁদাবাজ’ তথা
অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করে তাদের দমনের নামে সর্বাত্মক এই নিপীড়ন চালিয়ে যাচ্ছে।
তারই অংশ হিসেবে গত মে মাসে ১ জন আহত, ১ জনকে আটকাবস্থায় অমানুষিক নির্যাতন, অন্তত ২৬টি বাড়িতে তল্লাসী, ৪টি জুমঘর ভেঙে দেয়া, ১টি বৌদ্ধ বিহার নির্মাণে বাধা, ১টি নতুন সেনাক্যাম্প নির্মাণের উদ্যোগসহ প্রায় প্রতিনিয়ত সেনা টহল অভিযান, অহেতুক হয়রানি ও হুমকি প্রদান করা হয়েছে। এছাড়া বান্দরবানে সেনাবাহিনীর আলিকদম-কুরুকপাতা- পোয়ামুহুরী সড়ক নির্মাণের ফলে ম্রো, ত্রিপুরা ও মারমা জনগোষ্ঠীর ৬০ পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণের জাতীয় অস্তিত্ব ও জন্মভূমির অস্তিত্ব সংরক্ষণের লড়াইকে ধ্বংস করার জন্য এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাশাসন স্থায়ীকরণসহ পার্বত্য চট্টগ্রামে ইসলামী সম্প্রসারণ সুপ্রতিষ্ঠিত করার লক্ষে সরকার ও রাষ্ট্রীয় বাহিনী প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে আশ্রয়-প্রশ্রয়, মদদ ও পৃষ্টপোষকতা দিয়ে সংস্কারপন্থী ও গণতান্ত্রিক-ইউপিডিএফ খ্যাত সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে ব্যবহার করে পার্বত্য চট্টগ্রামে এক ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে চলেছে। বস্তুত সরকার ও রাষ্ট্রীয় বাহিনী এইসব সশস্ত্র গোষ্ঠীকে তাদের ক্রীড়নকে পরিণত করে তাদেরকে দিয়ে খুন, অপহরণ, মুক্তিপণ, চাঁদাবাজি, হুমকি প্রদান করে যাচ্ছে এবং চুক্তি বাস্তবায়নের আন্দোলনে সোচ্চার অধিকারকর্মী ও জনগণকে জিম্মী করে রাখার অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

ইতোমধ্যে রাষ্ট্রীয় বাহিনী প্রত্যক্ষ সহযোগিতা ও স্কর্ট দিয়ে এইসব সশস্ত্র গোষ্ঠীকে খাগড়াছড়ি জেলা থেকে রাঙ্গামাটি জেলার সুবলং, রাঙামাটি সদরের বিভিন্ন স্থান এবং বান্দরবান জেলায় নিয়ে এসে জনগণের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেয়ার ষড়যন্ত্র জোরদার করেছে। বিগত মে ২০২০ মাসে সংস্কারপন্থী ও গণতান্ত্রিক-ইউপিডিএফ কর্তৃক ৭ জন এবং মগপাটি কর্তৃক ১ জন, মোট ৮ জন অপহৃত, অপহরণের পর মোটা অংকের মুক্তিপণ আদায়, ২ জনকে মারধর, ৩ জন নারীকে হুমকি, ৩টি জায়গায় গুলি বর্ষণ এবং অসংখ্য পরিবার ও পেশাজীবীর কাছ থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে।

রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলাধীন লংগদু উপজেলায় বাঙালি সেটেলারের সাম্প্রদায়িক হামলায় ৬ জন জুম্ম আহত এবং বাঘাইছড়ি উপজেলার আমতুলী ইউনিয়নে একজন জুম্ম প্রহৃত হন। করোনাভাইরাসের পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে বান্দরবান জেলার আলিকদম উপজেলায় স্বেচ্ছাসেবকলীগের সাবেক সভাপতি জয়নাল আবেদিন কর্তৃক তৈন মৌজার নয়াপড়া ইউনিয়নের এলাকা হতে হাজার হাজার ঘনফুট পাথর অবৈধভাবে উত্তোলন করে পাচার করা; থানচিতে সাংগু সেতুর পাশ্ববর্তী সাংগু নদী থেকে ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগের নেতাসহ ২ ব্যবসায়ী কর্তৃক অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করা এবং লামা বন বিভাগের আওতাধীন বমু রিজার্ভ এর কুলাইক্ষাঝিরি হতে ৭০ বছরের উর্দ্ধে এইসব দুর্লভ মাতৃবৃক্ষ কেটে পাচার করার ঘটনা ঘটেছে।
সেনাবাহিনী-বিজিবি কর্তৃক ১ জন আহত, ১ জন আটকাবস্থায় নির্যাতিত, ২৬টি বাড়িতে তল্লাসী, অসংখ্য হয়রানির ঘটনা
১। ১ মে ভোররাত আনুমানিক ২.৩০ ঘটিকা হতে ৪.০০ ঘটিকার মধ্যে বান্দরবান পার্বত্য জেলাধীন রোয়াংছড়ি উপজেলার রোয়াংছড়ি সেনা ক্যাম্প থেকে উপজেলার আলেক্ষ্যং ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ডের ওয়াগই পাড়ায় ৭টি বাড়িতে তল্লাসী চালায়। তল্লাসীর শিকার বাড়িগুলির মালিক হচ্ছেন –  বিশ্বনাথ তঞ্চঙ্গ্যা (৪৮), চেয়ারম্যান, আলেক্ষং ইউনিয়ন; বিমল তঞ্চঙ্গ্যা (কারবারি) (৮০), স্বপ্ন সেন তঞ্চঙ্গ্যা (৩৮), রবীন্দ্র সেন তঞ্চঙ্গ্যা (৪১), দেবাশীষ তঞ্চঙ্গ্যা (শিক্ষক) (৪০), জ্ঞান রঞ্জন তঞ্চঙ্গ্যা (সাবেক প্রধান শিক্ষক) (৭০) ও রিগ্যান বড়ুয়া (৩৫)।
২। ১ মে আনুমানিক রাত ১০.৩০ ঘটিকা হতে ১২:০০ ঘটিকার সময় রোয়াংছড়ি সেনা ক্যাম্পের সেনাবাহিনীর অপর একটি দল রোয়াংছড়ি সদর ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ডের তাইম্রংছড়া পাড়ায় টহল অভিযান চালায়। এসময় রাত্রি কুমার তঞ্চঙ্গ্যা (কারবারি) (৫২), লক্ষী কুমার তঞ্চঙ্গ্যা (৪৮), রাঙ্গো লাল তঞ্চঙ্গ্যা (৪৮), কালো সেন তঞ্চঙ্গ্যা (৪০), মিলন তঞ্চঙ্গ্যা (৫০) ও সুন্দ লাল তঞ্চঙ্গ্যা (মাঝি) (৫৫) নামে গ্রামের ৬ জন গ্রামবাসীকে অহেতুক জিজ্ঞাসাবাদ ও হয়রানি করে। এছাড়াও এসময় গ্রামের অন্তত ৬টি ঘরবাড়ি তল্লাশি করে সেনা সদস্যরা।
৩। ২ মে গভীর রাত আনুমানিক ১.০০ ঘটিকা হতে ৩.০০ ঘটিকা পর্যন্ত রোয়াংছড়ি সেনা ক্যাম্প থেকে একদল সেনাসদস্য উপজেলার আলেক্ষ্যং ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ডের নাতিংঝিড়ি পাড়ার ১০ ব্যক্তির বাড়িতে তল্লাশী চালায়। বাড়িগুলি হলসানু তঞ্চঙ্গ্যা (৪৮), লিক্ক্যা তঞ্চঙ্গ্যা (৫০), কোলি তঞ্চঙ্গ্যা (২৭), মোহন লাল তঞ্চঙ্গ্যা (৬৫), ওয়াসিন তঞ্চঙ্গ্যা (২৭), অরবিন্দু তঞ্চঙ্গ্যা (৭৫), খোকন তঞ্চঙ্গ্যা (৩৫), পারিক্যা তঞ্চঙ্গ্যা (৫০), শাসন মনি তঞ্চঙ্গ্যা (কারবারি) (৭০) ও দিলি কুমার তঞ্চঙ্গ্যা (৫০)।
৪। ৪ মে রাঙ্গামাটি জেলার কাপ্তাই সেনা জোন কর্তৃক গ্রেফতারকৃত কাপ্তাই উপজেলার রাইখালী ইউনিয়নের ৮নং ওয়ার্ডের নির্বাচিত সদস্য সুইচাপ্রু মারমাকে কাপ্তাই সেনা জোনে নিয়ে অবৈধভাবে ৭ দিন ধরে অমানুষিক মারধরের পর গুরুতর আহত অবস্থায় সেনাবাহিনী ছেড়ে দেয়। উল্লেখ্য, গত ২৭ এপ্রিল সুইচাপ্রু মারমাকে কাপ্তাই সেনা জোন কর্তৃক গ্রেফতার করা হয়।
৫। ৫ মে রাঙ্গামাটি জেলার বিলাইছড়ি উপজেলাধীন কেংড়াছড়ি ইউনিয়নের ৫নং ওয়ার্ডের মেরাংছড়া মারমা পাড়ায় একটি নতুন সেনা ক্যাম্প স্থাপনের কাজ শুরু করা হয়েছে।
৬। ৫ মে ২০২০ রাত আনুমানিক ১০:০০ টার দিকে বাঘাইছড়ির সিজকমুখ নতুন সেনা ক্যাম্পের ওয়ারেন্ট অফিসার মো: সাহাদাতের নেতৃত্বে ঐ সেনা ক্যাম্পের একদল সেনাসদস্য পার্শ্ববর্তী শিজক গলাচিবা গ্রামের কীর্তি রঞ্জন চাকমা ওরফে ভুত্তো লাল-এর বাড়ি ঘেরাও করে। কীর্তি রঞ্জন চাকমাকে বাড়িতে না পেয়ে তার স্ত্রীকে হরয়ানিমূলকভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করে এবং বিভিন্ন প্রকারহুমকি প্রদান করে। এরপর সেনাদলটি একই গ্রামের প্রীতি চাকমার বাড়িও ঘেরাও করে।
৭। ১২ মে বিকাল আনুমানিক ৩:৩০ টার দিকে খাগাড়াছড়ি পার্বত্য জেলাধীন মাটিরাঙ্গা উপজেলার মাটিরাঙ্গা সেনাজোনেরঅধীন শিচক সাবজোনের জনৈক মেজরের নেতৃত্বে ২০ জনের একটি সেনাদল ৪ জুম্ম জুমচাষীর জুমঘর ভেঙে দেয় এবং জুমে লাগানো অনেক কলা গাছের চারা উপড়ে ফেলে দেয়। উক্ত ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত জুমচাষীরা হলেন- রুপসী পাড়ার উপেন্দ্র ত্রিপুরা (কার্বারী) (৬৩), জল কুমার পাড়ার আপন কুমার ত্রিপুরা (৩৮), তাংতুং পাড়ার পূর্ণ কুমার ত্রিপুরা (৬৫) ও পাইলা কুমার ত্রিপুরা (৫৩)।
৮। ১৫ মে খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলাধীন মাটিরাঙ্গা উপজেলায় বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী স্থানীয় জুম্ম গ্রামবাসীরা একটি বৌদ্ধ বিহার নির্মাণ করার সময় মাটিরাঙ্গা উপজেলার সীমান্তবর্তী রামগড় উপজেলার রামগড় লাচারিপাড়া বিজিবি ক্যাম্পের বিজিবি সদস্যরা বাধা দেয় এবং বিজিবি সদস্যদের হুমকিতে গ্রামবাসীরা বিহার নির্মাণ কাজ বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়।
৯। ২২ মে, রাত আনুমানিক ১.০০ টা হতে ২.৩০ ঘটিকা পর্যন্ত বান্দরবান জেলার রোয়াংছড়ি উপজেলার রোয়াংছড়ি সেনা ক্যাম্প থেকে ২০-২৫ জনের একদল সেনাসদস্য নাতিংঝিরি নামক তঞ্চঙ্গ্যা গ্রামে তল্লাসী চালায়। এসময় ঘুমন্ত গ্রামবাসীদেরকে ঘুম থেকে তুলে এক জায়গায় জড়ো করে জিজ্ঞাসাবাদ ও হয়রানি করে।
১০। ২৫ মে, রাত আনুমানিক ৮:০০ টায় উক্ত সিজকমুখ নতুন সেনাক্যাম্পের একদল সেনাসদস্য সিজকমুখ উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক তুষার কান্তি চাকমার বাড়ি ঘেরাও করে বাড়িতে তল্লাসী চালায়।
১১। ২৬ মে, কোভিড-১৯ মহামারীর কারণে সৃষ্ট দুর্ভোগ সময়েও রোয়াংছড়ি সেনা ক্যাম্পের সেনাবাহিনী বিভিন্ন গ্রামে এসে গ্রামবাসীদের বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করে এবং গ্রামবাসীদের ছবি তোলে। এসময় বান্দরবান সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক জ্ঞান রঞ্জন চাকমা ও তার পরিবারের সদস্যদেরও তথ্য সংগ্রহ করা হয় এবং ছবি তোলা হয়।সেনাবাহিনীর অপর একটি দল ঐদিন সকাল ১০ ঘটিকায় রোয়াংছড়ির ব্যাঙছড়ি দোকান পাড়ায় ছবি তোলার কার্যক্রম শুরু করে।
১২। ২৬ মে, বিকাল ৩.৩০ ঘটিকা সময় রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলাধীন জুরাছড়ি উপজেলার সেনাবাহিনীর বনযোগীছড়া জোনের অধীনে ১৬১০ ক্যাম্প নামে ক্যাম্পের সেনা সদস্যরা টার্গেট শুটিং কালে জুরাছড়ি উপেজলাধীন বনযোগীছড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের ৯ম শ্রেণির ছাত্র রিপন চাকমা গুলিবিদ্ধ হয়। আহত রিপন চাকমার অবস্থা অবনতি হলে সেনা কর্তৃপক্ষ তাকে চট্টগ্রাম সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে নিয়ে যায়।
১৩। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ১৬ নির্মাণ প্রকৌশলী ব্যাটালিয়ন (১৬ ইসিবি) কর্তৃক নির্মাণাধীন বান্দরবান পার্বত্য জেলার আলিকদম উপজেলা হতে আলিকদম-কুরুকপাতা-পোয়ামুহুরী সড়কের ফলে আলিকদম উপজেলার কুরুকপাড়া ইউনিয়নের ১৩টি আদিবাসী জুম্ম গ্রামের ম্রো, ত্রিপুরা ও মারমা জনগোষ্ঠীর ৬০ পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
১৪। ৩১ মে জুরাছড়ি উপজেলাধীন বনযোগীছড়া জোনের অধীন যক্ষাবাজার আর্মি ক্যাম্প থেকে ওয়ারেন্ট অফিসার আবুল মোমিন নেতৃত্বে ১৮/১৯ জনের একদল সেনা সদস্য ১নং জুরাছড়ি ইউনিয়নের ৭নং ওয়ার্ডের সাপছড়ি এলাকায় টহল দেয়।
১৫। ৩১ মে বিকাল আনুমানিক ৫:০০ টার দিকে সেনাবাহিনী স্কর্ট দিয়ে সংস্কারপন্থী একটি সশস্ত্র দল রাঙামাটি সদর উপজেলাধীন জীবতলি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান পাড়ায় পৌঁছে দিয়েছে।
১৬। ৩১ মে সকাল আনুমানিক ১০ ঘটিকায় রাঙামাটি জেলার জুরাছড়ি উপজেলা জোনের (৭ বীর) নিয়ন্ত্রিত রাজমনি পাড়া আর্মী ক্যাম্প হতে ৩০/৩৫ জনের একদল সেনা বাদলছড়ি ও কইন্দ্যা মধ্যবর্তীস্থানে একটি সেগুন বাগানে টহল দেয়।
১৭। ৩১ মে, সেনাবাহিনী স্কর্টদিয়ে ১৫ জনের অধিক সংস্কারপন্থী ও ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক)-এর একদল সশন্ত্রসদস্য খাগড়াছড়ি জেলা থেকে বান্দরবান জেলার রোয়াংছড়ি উপজেলায় বাঘমারায় পৌঁছে দেয়।

সেনা-সমর্থিত সংস্কারপন্থী, গণতান্ত্রিক ইউপিডিএফ ও মগ পার্টিকর্তৃক ৮ জন অপহৃত, ২ জনকে মারধর, ৩ নারীকে হুমকি, ৩টি জায়গায় গুলি বর্ষণ
১। ৬ মে, বিকেলে এএলপি থেকে দলচ্যুত তথাকথিত মগ পার্টি নামধারী সেনা-সমর্থিত ও স্থানীয় আওয়ামীলীগ মদদপুষ্ঠ সেনা-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী বান্দরবান জেলার রুমা উপজেলায় রিজুক কার্বারী প্রুসানু মারমাকে (৩৮) অপহরণ করে।নিখোঁজ ব্যক্তিদের খোঁজ করতে গেলে সন্ত্রাসীরা গ্রামবাসীদের লক্ষ্য করে গুলি চালায়। ৭ মে, সকালে অপহৃত কার্বারীর স্ত্রীকে ফোন করে অপহরণকারীরা চাঁদা দাবি করে।
২। ৮ মে, শুক্রবার সন্ধ্যার দিকে সেনাবাহিনী সমর্থিত সংস্কারপন্থী সন্ত্রাসী কর্তৃক খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার মাটিরাঙ্গা বাজার থেকে সুধীর ত্রিপুরা ওরফে কাবলি (৪৫), পিতা-পূর্ণজয় ত্রিপুরা নামে এক জুম্ম গ্রামবাসী অপহৃত হয়। অপহরণকারীরা সুধীর ত্রিপুরার মুক্তিপণ হিসেবে ৫ লক্ষ টাকা দাবি করে।
৩। ১১ মে, সোমবার খাগড়াছড়ি জেলার মাটিরাঙ্গা উপজেলার মাটিরাঙ্গা বাজারে নুকুল ত্রিপুরা (৪২) নামে এক ত্রিপুরা মটরসাইকেল চালককে সেনা-সমর্থিত ইউপিডিএফ-গণতান্ত্রিক সশস্ত্র সন্ত্রাসী কর্তৃক অপহরণ ও অমানুষিকভাবে মারধর করা হয়। পরে মুক্তিপণ বিনিময়ে অপরহণকারীরা তাকে দেয়।
৪। ১২ মে, বিকেল আনুমানিক ৩.০০টার দিকে সেনা-সমর্থিত সংস্কারপন্থী সন্ত্রাসীদের কর্তৃক রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলাধীন বরকল উপজেলার সুবলং ইউনিয়নের সুবলং বাজারে গেলে বরকল ইউনিয়নের বিল্লছড়া গ্রামের জুয়েল চাকমা (২৭) নামে এক নিরীহ গ্রামবাসী অমানবিকভাবে মারধরের শিকার হন।
৫। ১৩ মে, এলাকায় আতঙ্ক সৃষ্টি, পরিস্থিতিকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করা ও সেনা-সমর্থিত সংস্কারপন্থী সশস্ত্র গ্রুপের আধিপত্য প্রশস্থ করার লক্ষ্যে সেনা-মদদপুষ্ঠ সংস্কারপন্থী সশস্ত্র গ্রুপ কর্তৃক রাতের অন্ধকারে বান্দরবানের কুহালঙে অন্তত দু’টি জায়গায় এবং রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়িতে অন্তত একটি জায়গায় ব্রাশ ফায়ার করা হয়।
৬। ১৪ মে, দুপুরের দিকে, সংস্কারপন্থী সন্ত্রাসীদের একটি দল চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার রাণীরহাটের পাহাড়িকা বাস কাউন্টার থেকে বরকল উপজেলার উপজেলা সরকারী হাসপাতালের নার্স তপন চাকমা (৩৫) নামে এক জুম্ম পুরুষ নার্সকে অস্ত্রের মুখে অপহরণ করে নিয়ে যায়। পরে মোটা অংকের মুক্তিপণের বিনিময়ে সন্ত্রাসীরা তপন চাকমাকে ছেড়ে দেয়।
৭। ১৪ মে, ভোররাতে রাঙামাটি জেলার রাজস্থলী উপজেলায় গাইন্দা ইউনিয়নের ফয়তু পাড়া নামক এলাকা থেকে মগপার্টির সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা শুমেউ মং মারমা (৫২) ও শিসু মারমা (৫০) নামে দুই মারমা গ্রামবাসীকে অপহরণ করে।
৮। ১৬ মে, সকালে রাঙামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলার করেঙাতলি বাজার থেকে সেনা-মদদপুষ্ট সংস্কারপন্থী ও ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) সন্ত্রাসীরা জিদং চাকমা ওরফে দাড়ি (৪৫) নামে এক নিরীহ ব্যক্তিকে অপহরণ করে।
৯। ২০ মে, রাত ৮.৩০ ঘটিকার সময় রাঙ্গামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলায় সেনা-সমর্থিত সংস্কারপন্থীরা বাঘাইছড়ি উপজেলার খেদারমারা ইউনিয়নের নলবনিয়া গ্রামের সাধন পূর্ণ চাকমা ওরফে বলি বাপ-এর বাড়ি তল্লাসী চালায়।
১০। ২৩ মে, দুপুর ১২:০০ ঘটিকার দিকে সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় সংস্কারপন্থী ও ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) সন্ত্রাসীরা খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলার বাবুছড়ায় বাবুছড়ার উদলবাগান থেকে জুম্ম ফিল্ম এসোসিয়েশনের (জুপা) প্রতিষ্ঠাতা জ্ঞানকীর্তি চাকমাকে অপহরণ করে।
১১। ৩১ মে সংস্কারপন্থী ও ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) সদস্যরা বরকল উপজেলার চাকরিজীবীদের কাছ থেকে এবং জুরাছড়ি ও বাঘাইছড়ি এলাকায় গ্রামবাসীদের কাছ থেকে ফোনে প্রতিটি গ্রাম ও পরিবার থেকে চাঁদা দাবি করছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
১২। ৩১ মে, সংস্কারপন্থী ও ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) সদস্যরা জীবতলী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান পাড়ার পৌঁছার পর পুরো এলাকা ঘেরাও করে এবং জগদীশ চাকমাসহ কয়েকজন লোক ধরে নির্যাতন করে। কয়েকজনের মোবাইল ফোন কেড়ে নেয়।
১৩। ৩১ মে, সংস্কারপন্থীরা জীবতলী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান পাড়ার সমীরণ চাকমার বাড়ি ঘেরাও করে। তবে সমীরণ চাকমা বাড়িতে না থাকায় তার স্ত্রী রেফা চাকমাকে নানা হুমকি প্রদান করে। এ সময় সমীরণ চাকমার দুই মেয়ে রূপবতী চাকমা ও মিশু চাকমাকেও সংস্কারপন্থীরা নানাবিধ হুমকি প্রদান করে।

মুসলিম সেটেলারের সাম্প্রদায়িক হামলায় আহত ৬ জন, প্রহৃত ১ জন
১। ৯ মে, সকাল ৭:৩০ টার দিকে রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলাধীন লংগদু উপজেলার হাড়িকাবা সংলগ্ন হ্রদ এলাকায় একদল বাঙালি সেটেলার ফলজ পণ্যবাহী জুম্মদের দুটি ট্রলার বোটে হামলা চালিয়ে অন্তত ৬ জন জুম্মকে আহত করে। লংগদু সদর ইউনিয়নের ধুধুকছড়ি গ্রামের একদল জুম্ম গ্রামবাসী বিভিন্ন মৌসুমী ফলমূল নিয়ে দুইটি ট্রলার বোট যোগে রাঙ্গামাটির উদ্দেশ্যে যাওয়ার সময় এই ঘটনা ঘটে। আহত ব্যক্তিরা হলেন- দয়াল চন্দ্র চাকমা (৫২), প্রসিত চাকমা ওরফে ধনবান (৪৫), ধনমনি চাকমা (৩০), সুমতি চাকমা ওরফে নাগা (৪৭), ভগিরথ চাকমা (৩৫), এবং ধনবান চাকমা। হামলার সময় মুসলিম সেটেলাররা জুম্মদের কাছ থেকে মোবাইল, টাকা ছিনিয়ে নিয়ে যায় এবং ফলমূল হ্রদের পানিতে ফেলে দেয়।
২। ২২ মে ২০২০ শুক্রবার বিকেলে রাঙ্গামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলার আমতুলী ইউনিয়নে প্রমোদ চাকমা (৩৮) নামে এক জুম্ম লিচু বিক্রেতা আমতুলী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান রাসেল চৌধুরীর নেতৃত্বেএকদল সেটেলাররা মারধর করে।

ভূমি বেদখল ও পরিবেশ বিধ্বংসী কর্মকান্ড

১। বান্দরবান জেলার আলিকদম উপজেলায় একজন প্রভাবশালী স্বেচ্ছাসেবকলীগের সাবেক সভাপতি জয়নাল আবেদিন কর্তৃক করোনাভাইরাসের পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে তৈন মৌজার নয়াপড়া ইউনিয়নের এলাকা হতে প্রতিদিন হাজার হাজার ঘনফুট পাথর অবৈধভাবে উত্তোলন করে পাচার করেছে। প্রতিদিন ট্রাক যোগে প্রায় এক থেকে দুইটি গাড়িতে করে পাথর বোঝাই করে নিয়ে বিভিন্ন স্থানে মজুদ করেছে লক্ষাধিক ঘনফুট পাথর। যদি পাথর উত্তোলন বন্ধ না হয় তাহলে আলিকদমে পরিবেশ বিপর্যস্ত হবে বলে এলাকাবাসী দাবি।
২। বান্দরবান জেলার থানচিতে সাংগু সেতুর পাশ্ববর্তী সাংগু নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করার অভিযোগে ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগের নেতাসহ ২ ব্যবসায়ীকে দীর্ঘদিন ধরে সড়ক উন্নয়নের নাম করে ও নিরাপত্তাবাহিনীর নাম ভাঙ্গিয়ে সাংগু নদী থেকে প্রতিনিয়ত অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করে চলেছে। ভারী যন্ত্র (স্কেভেটর) দিয়ে বালি উত্তোলন করা হচ্ছে। ১৫ মে, ভ্রাম্যমান আদালত অভিযান চালিয়ে তাদেরকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করেছে।
৩। ১৫ মে, শুক্রবার রাত ২টা ৩০ মিনিটে বান্দরবান জেলার লামা বন বিভাগের আওতাধীন বমু রিজার্ভ এর কুলাইক্ষাঝিরি হতে চুরি করে গাছ কেটে পাচারকালে মাতৃবৃক্ষ গর্জন ও তেলশুর কাঠ ভর্তি ২টি জীপসহ ১ জন গাড়ির শ্রমিককে আটক করেছে বন বিভাগ ও সেনাবাহিনী। ৭০ বছরের উর্দ্ধে এইসব দুর্লভ মাতৃবৃক্ষ প্রশাসনের চোখকে ফাঁকি দিয়ে সড়কপথে ও মাতামুহুরী নদী পথে নিয়ে যাচ্ছে বমু বিলছড়ি ইউনিয়নের কয়েকটি সিন্ডিকেট ও বমু বিলছড়ি ইউনিয়নের সরকারি দলের কিছু লোকজন।

মে ২০২০: পার্বত্য চট্টগ্রামের মানবাধিকার পরিস্থিতির উপর মাসিক প্রতিবেদন বাংলায়

মে ২০২০: পার্বত্য চট্টগ্রামের মানবাধিকার পরিস্থিতির উপর মাসিক প্রতিবেদন ইংরেজিতে

……………………………………………………………………………………………………………………
পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির তথ্য  প্রচার বিভাগ কর্তৃক সমিতির কেন্দ্রীয় কার্যালয়কল্যাণপুররাঙ্গামাটিপার্বত্য চট্টগ্রামবাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত  প্রচারিত

প্রেস বিজ্ঞপ্তি

Facebook Comments

এক নজরে

’করোনা কালে আদিবাসী ছাত্রনেতাদের ভাবনা’ শীর্ষক অনলাইন আলোচনা আগামীকাল

আচিক নিউজ ডেস্ক : আগামীকাল ৫ জুলাই, রবিবার সন্ধা ৭টায় ‘করোনা কালে আদিবাসী ছাত্রনেতাদের ভাবনা’ শীর্ষক …

error: Content is protected !!