প্রথম পাতা / ধর্ম / ‘সকাতরে ওই কাঁদিছে সকলে’

‘সকাতরে ওই কাঁদিছে সকলে’

ফা: গৌরব জি. পাথাং,সিএসসি : কাল সারারাত অঝোরে বৃষ্টি পড়েছে । কিন্তু এ যেন বৃষ্টি নয়, অসহায় মানুষের অঝোর কান্না । ঘুম দস্যুর মত আমায় আঁকড়ে ধরে রেখেছে ।বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ানোর মত শক্তি হারিয়ে ফেলেছি । নেশা গ্রস্ত মানুষের মত শরীর বিছানায় ফেলে দিয়ে চোখ বুজে আছি । ও দিকে গির্জার ঘন্টা বেজে উঠেছে । ঘুম থেকে উঠতে হবে । কারণ ঘন্টা যেন ঈশ্বরের ডাক । ঈশ্বরের ডাক উপেক্ষা করবার মত শক্তি আমার নেই । এক্ষুনি গির্জায় যেতে হবে । জানি, গির্জায় কোন খ্রীষ্টভক্ত নেই। তাদের উপস্থিতি ছাড়াই আমাকে প্রার্থনা করতে হবে। হ্যাঁ, প্রার্থনা করতে হবে তাদেরই জন্য ।

গিয়ে দেখি তিনজন সিস্টার কনভেন্ট থেকে এসেছে প্রার্থনায় যোগ দিতে । ওদের কণ্ঠে শোনা যাচ্ছে প্রার্থনা সঙ্গীত- “সকা তরে ওই কাঁদিছে সকলে, শোন শোন পিতা/ কহ কানে কানে শোনাও প্রাণে প্রাণে মঙ্গল বারতা।” কত দরদ নিয়ে গাইছে গানটি । এর আগে কতবার গানটি শুনেছি । কিন্তু কই এমন তো লাগেনি! এমন মধুর, এমন আবেগ কখনও অনুভব করিনি তো? মনে হচ্ছে গানটি আজ সবার প্রাণের কথাই বলছে। সারা বিশ্বের কত মানুষের কত কান্না! কত হাহাকার! দরিদ্র মানুষের অনাহারের কান্না, মাকে হারিয়ে অবুঝ শিশুর কান্না, ভালবাসার মানুষটিকে হারিয়ে সন্ত্বনাহীন কান্না । পথের ধারে থাকা রিক্সা চালক, দোকানদার, গার্মেন্টসকর্মীদের কান্না যেন থামছেই না ।

এরই মধ্যে খবর পেলাম আমার পরিচিত এক নার্স করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে। সে তার ছোট জমজ দুইসন্তানকে রেখে হাসপাতালে কোয়ারাইন্টানে আছে। দুই সন্তান কেবলই কান্নাকরে বলছে, মা কোথায়? মা কবে আসবে? ওরা থাকে সুনামগঞ্জে আর ওদের বাবা থাকে ঢাকা শহরে । তারা কোনসান্ত্বনাই মানছে না । বৃদ্ধ-বৃন্ধা, অসুস্থদের নিয়েও বিপাকে পড়তে হচ্ছে । হাসপাতালে চিকিৎসক নেই, চিকিৎসা সেবা বন্ধ, সুচিকিৎসার অভাবে রোগীরা দিনদিন মৃত্যুর দিকে ঢলে পড়ছে। করোনাভাইরাসের কারণে কত মানুষ মারা যাচ্ছে পৃথিবীতে । কিন্তু আত্মীয় স্বজনতাদের শেষ বিদায় জানাতে পারছেনা, তাদের অন্তেষ্টিক্রিয়া অনুষ্ঠানে, সমাধিতেও যেতে পারছেনা । দূর থেকে বিদায় জানাতে হচ্ছে, প্রার্থনা করতে হচ্ছে। এমন মৃত্যু কেউ কি প্রত্যাশা করে? এমন মৃত্যু কেউ তো চায়না । এই শোকার্তদের সান্ত্বনা দিবে কে? সান্ত্বনার ভাষা নেই ।

কত অভিযোগ আসে ফাদারদের নামে। কেন ওর সমাধিতে গেলেন না ? কেন অন্তেষ্টিক্রিয়া অনুষ্ঠান পরিচালনা করলেন না? জীবিত কালে লোকটা কত মিশনে সাহায্য করেছে, সেবা দিয়েছে, কত কাজ করেছে আর মৃত্যুর পর কেন তাকে দেখতে গেলেননা? কেন লোকের সমাগম হলনা? কেন লোকেরা দেখতে এলনা ? ও কী অন্যায় করেছে? এমনতাবস্থায় লোকেরা আমাদের কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। আমরাও তাদের কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছি । অথচ একদিন আমরাই গির্জায় শিক্ষা দিয়েছিলাম গির্জায় লোকদের কেআসার জন্য কিন্তু আজ আমরাই তাদের নিরুৎসাহিত করছি, নিষেধ করছি গির্জায় আসার জন্য । গির্জায় শিক্ষা দিতাম সামাজিক বন্ধন দৃঢ় করার জন্য, সমাজে মিলেমিশে থাকার জন্য, একত্রে থাকার জন্য আর এখন শিক্ষা দিচ্ছি সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার জন্য, ঘরে থাকার জন্য। কি এক অদ্ভূত পরিস্থিতির মধ্যে আছি । গির্জা শূন্য, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শূন্য, কনভেন্ট ও সেমিনারীও শূন্য। গির্জায় বিয়ে দেওয়া, দীক্ষাস্নান, হস্তার্পণ, খ্রীষ্ট প্রসাদ সংস্কার প্রদান, ধর্ম শিক্ষা কোনটাই নেই। সীমিত আকারে চলছে সমাধি দেওয়া ও রোগী লেপন সংস্কার প্রদান । অথচ একদিন এই গির্জা ছিল লোকদের উপস্থিতিতে মুখরিত । সম্মিলিত প্রার্থনা সঙ্গীতে ছিল স্বর্গীয় পরিবেশ।

আজ সবই ইতিহাস। গির্জায় প্রতিদিনের মত নিয়মানুযায়ী ঘন্টা বাজে কিন্তু বাইরে থেকে কোন খ্রীষ্টভক্ত আসেনা। পুরোহিতেরা খ্রীষ্টযাগ উৎসর্গ করছে আর অনলাইনে সম্প্রচারিত হচ্ছে । ঘরে বসে খ্রীষ্টভক্তেরা প্রার্থনা করছে। যে গির্জাগুলো এতদিন ছিল খ্রীষ্টভক্তে পরিপূর্ণ ছিল এখন শূন্যতা বিরাজ করছে। যারা এতদিন ঘন্টার ডাক উপেক্ষা করেছে, গির্জায় আসার প্রয়োজনীয় উপলব্ধি করেনি, তারা আজ গির্জায় আসার জন্য ছটফট করছে । আর আমরা পুরোহিতেরা যাদেরকে এতদিন কাছে পেয়েও মূল্য দিইনি, তাদের উপস্থিতি গুরুত্ব দিইনি, আমরা তাদের প্রয়োজনীয়তা এখন উপলব্ধি করছি। কে ভেবেছিল, একদিন ভাটিকানের সেন্ট পিটারস্ স্কয়ারশূন্য হবে, গির্জায় লোক থাকবেনা । চারিদিকে এত শূন্যতা, এত হতাশা-নিরাশার মাঝেও আশার প্রদীপ জ্বেলে সুদিনের প্রতীক্ষায় আছি । তাই তো প্রতিদিন গির্জায় গেয়ে যাই এই গান, “তোমার রাজ্য আসুক প্রভু, তোমার রাজ্য আসুক/এই নিরাশার পৃথিবীতে, এই হতাশার পৃথিবীতে, এই বেদনার পৃথিবীতে, তোমার রাজ্য আসুক প্রভু।”

লেখক: খ্রীষ্টান ধর্মযাজক, পরিচালক মরো সেমিনারী

gourobcsc@gmail.com

Facebook Comments

এক নজরে

লকডাউনের গান ‘আনচিং আন চেগেন ’ প্রকাশিত

আচিক নিউজ ডেস্ক : কোভিড-১৯ বা করোনা ভাইরাসের কারনে সারা পৃথিবীর মানুষের জীবনযাপনের ধরন পালটে …

error: Content is protected !!