প্রথম পাতা / জেলা ভিক্তিক সংবাদ / টাঙ্গাইল / চলেশ রিছিলের ত্রয়োদশ মৃত্যুবার্ষিকী আজ

চলেশ রিছিলের ত্রয়োদশ মৃত্যুবার্ষিকী আজ

আচিক নিউজ ডেস্ক: আজ ১৮ই মার্চ, চলেশ রিছিল হত্যা দিবস । আজ থেকে ১৩ বছর আগে ২০০৭ সালের এই দিনে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে দেশে জরুরী অবস্থা চলাকালে  মধুপুরের ইকোপার্ক বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক আদিবাসী নেতা চলেশ রিছিলকে যৌথবাহিনী অপারেশন ক্লিনহার্ডের নামে পাকিস্তানী হায়ানাদের কায়দায় পাশবিক নির্যাতন করে নির্মমভাবে হত্যা করে ।

আদিবাসী নেতা চলেশ রিছিলকে জানালার গ্রীলে ঝুলিয়ে অমানবিকভাবে টর্চার করে। তার ডান হাতের তিন আঙুলের নখ উপড়ে ফেলা হয়। তাঁর সারা শরীরে প্রচন্ড আঘাতের চিহ্ন দেখা যায়। মানুষ মানুষকে বিনা কারণে, বিনা বিচারে এত নির্যাতন করে হত্যা করলো অথচ ঘটনার পর পুলিশ একটি গল্প তৈরি করে বলে, দৌড়ানোর সময় পড়ে গিয়ে চলেশ জ্ঞান হারায়। আবার অন্যদিকে চলেশের মৃত্যুর কারণ ‘হার্ট অ্যাটাক’ বলে দাবি করেছিল যৌথবাহিনী।

দীর্ঘ ১৩ বছরে চলেশ রিছিলের সন্তানরা আজ অনেক বড় হয়ে গেছে। তারা আজও তাদের বাবার হত্যার বিচার চায়। চলেশের বাবা বনেন্দ্র দালবৎ সন্তান হত্যার বিচার দেখে যেতে না পারলেও যাতে তার স্ত্রী সন্তানেরা পারে। আদিবাসী নেতা চলেশ রিছিল হত্যার ১৩ বছর পূর্ন হলেও হত্যা মামলাটি আজও পুলিশ তালিকাভুক্ত করেনি। এই হত্যার ঘটনা নিয়ে দেশ বিদেশে ব্যাপক আলোচনা- সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছিল। তৎকালীন সেনা সমর্থিত সরকার এ ব্যাপারে একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করে। সেই কমিটির প্রতিবেদনও আলোর মুখ দেখেনি। সরকারের একাধিক মন্ত্রী চলেশ হত্যার বিচার হবে বলে কথা দিয়েছিলেন। কিন্তু তারাও কথা রাখেননি। এ নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে আদিবাসী নেতৃবৃন্দ ও চলেশ রিছিলের পরিবারের সদস্যদের।

মধুপুরে ইকোর্পাক বিরোধী আদিবাসীদের আন্দোলনের অন্যতম প্রধান সংগঠক ছিলেন চলেশ রিছিল। এজন্য বনবিভাগ ও স্থানীয় প্রশাসনের র্কমর্কতারা তার উপর ছিলেন বিক্ষুব্ধ।  ২০০৭ সালের ১৮ মার্চ ময়মনসিংহ থেকে মাইক্রোবাসযোগে মধুপুরের দিকে আসছিলেন চলেশ রিছিল।  মুক্তাগাছা উপজেলার কালীবাড়ি বাসস্ট্যান্ড এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা গাড়ি থেকে চলেশ, প্রতাব, তুহিন ও পীরেনকে ধরে মধুপুরের কাকরাইদে বিএডিসির খামার সেনাক্যাম্পে নিয়ে যায়। সেখানে দিনব্যাপী অত্যাচারের পর সন্ধ্যার দিকে চলেশ রিছিলের মৃত্যু হয়। চলেশ রিছিলের স্ত্রী সন্ধ্যারানী সিমসাংকে মধুপুর থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রিয়াজ হোসেনের মাধ্যমে জানানো হয়, চলেশকে গ্রেপ্তার করতে গেলে দৌড়ে পালানোর সময় তিনি হোঁচট খেয়ে পড়ে অজ্ঞান হয়ে যান। হাসপাতালে আনার পর তাঁর মৃত্যু হয়। ওই রাতেই মধুপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক কামরুজ্জামান মধুপুর থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা করেন। ময়নাতদন্ত শেষে পরদিন (১৯ মার্চ) চলেশের মৃতদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

২০ মার্চ তাঁকে সমাহিত করার পর তাঁর প্রথম স্ত্রী সন্ধ্যারানী সিমসাং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও বন বিভাগের কর্মকর্তাদের নাম উল্লেখ করে মধুপুর থানায় একটি মামলা করতে যান। পুলিশ অভিযোগ নিলেও সেটি মামলা হিসেবে গ্রহণ করেনি। ওই সময় বিষয়টি তদন্তের জন্য অবসরপ্রাপ্ত জেলা দায়রা জজ রফিক উদ্দিনের নেতৃত্বে এক সদস্যবিশিষ্ট বিচার বিভাগীয় কমিটি গঠন করে সরকার। কমিটি প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য গ্রহণ করে। কিন্তু আজও সেই তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি। ঘটনার পরপরই তিনটি মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক), বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট), অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (এএলআরডি) যৌথ অনুসন্ধান করে। অনুসন্ধানের বিষয়ে সে সময় সংবাদ সম্মেলন করে তারা জানিয়েছিল, চলেশ রিছিলের শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন ও রক্তের দাগ ছিল। দুই হাতের হাড় ও সব আঙুল ভাঙা ছিল। চলেশকে নির্যাতন করে মেরে ফেলা হলেও ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন খুনিদের নির্দেশনা অনুযায়ী দেওয়া হয়েছে। রহস্যজনক কারণে বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনও প্রকাশ করা হয়নি।

আদিবাসী নেতা চলেশ রিছিলের জন্ম ১৯৬৮ সালে টাঙ্গাইল জেলার মধুপুর উপজেলার মাগন্তিনগর গ্রামে ।তার পিতার নাম বনেন্দ্র দালবৎ ও মাতার নাম নীলমনি রিছিল । তিনি মধুপুর রানী ভবানী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাশ করে মধুপুর ডিগ্রি কলেজে অধ্যয়ন করেন । তিনি ছাত্র জীবন থেকেই রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন । দক্ষ ফুটবলার হিসাবেও তিনি সুপরিচিত ছিলেন । আদিবাসীদের অধিকার আদায়ে নেতৃত্ব দিতেন অগ্রভাগে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন প্রতিবাদী কন্ঠস্বর এবং ইকোপার্ক বিরোধী আন্দলনের অন্যতম সংগঠক ।

Facebook Comments

এক নজরে

নালিতাবাড়ীতে গারো শিশু ধর্ষণের অভিযোগে কিশোর গ্রেফতার

আচিক নিউজ ডেস্ক: শেরপুরের নালিতাবাড়ীতে এক গারোশিশু ধর্ষণের অভিযোগে চিথন নকরেক (১৭) নামে এক গারো …

error: Content is protected !!