শিরোনাম
প্রথম পাতা / আইন / যে কারণে আ.খিং প্রথা ধরে রাখা যায়নি

যে কারণে আ.খিং প্রথা ধরে রাখা যায়নি

মিকরাক ম্রং সোহেল :বিশাল এলাকা নিয়ে এই ভূমির সীমানা গঠিত। স্মরণাতীত কাল থেকে এই ভূমি একটি পরিবারের নিয়ন্ত্রণে ভোগ-দখল হয়। এই ভূমির অংশ মাহারীর অন্য লোকদের ব্যবহারের জন্য প্রদান করা হয়ে থাকে। অর্থাৎ, এই ভূমি মাহারীর লোকজন নিজেরা ভাগ-বাটোয়ারা করে নিজেদের জীবিকা অর্জনের জন্য ব্যবহার করে থাকে। এই ধরনের ভূমি মাহারীর লোকজন সবাই ভোগ করলেও এর নিয়ন্ত্রণ একটি পরিবারের হাতেই থাকে। আ.খিং ভূমি মালিক-পরিবারের মায়ের পর কন্যা উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত হয়। (Fr. G. Costa: The Garo Code of Law, Anhtropos, Vol. 49, 1954, p- 1057)

আ.খিং ভূমিকে সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করার জন্য গারো হিলস এর ডিস্ট্রিক্ট কাউন্সিল আখিং এর উপযুক্ত সংজ্ঞা প্রদান করেছে। ডিস্ট্রিক্ট কাউন্সিল এর মতে,আ.খিং হল-ক) সেই ভূমি যা কোন চাচ্চি বা মাচং এর মালিকানায় থাকে। সেই চাচ্চি বা মাচং এর প্রধান হিসেবে জেলা পরিষদ কর্তৃক স্বীকৃত নকমা এই ভূমির তত্ত্বাবধান করে বাখ) সেই ভূমি যা একটি গ্রামের একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের বা বিশেষ গোষ্ঠীর সামষ্টিক মালিকানায় থাকে। এই ভূমি সেই বিশেষ সম্প্রদায়ের বা বিশেষ গোষ্ঠীর প্রধান হিসেবে জেলা পরিষদ কর্তৃক স্বীকৃত নকমা তত্ত্বাবধান করে। (The Garo Hills District Council Acts, Regulations, etc., 1954, p. 17)

আ.খিং সাধারণত কোন চাচ্চি বা মা.চং কিংবা মাহারী অথবা বিশেষ সম্প্রদায়ের মালিকানার সম্পত্তি। ঐ চাচ্চি বা মা.চং বা সম্প্রদায়ের নকমা এই সম্পত্তি নিয়ন্ত্রণ করেন। নকমা আ.খিং এর কোন অংশ ব্যবহারের উপর আ.উইল বা খাজনা ধার্য এবং সংগ্রহ করেন। (মারাক, জুলিয়াস এলআর, গারো কাস্টমারি ল’জ ট্রেডিশনস এন্ড প্র্যাকটিসেস, পৃ- ৩৪৪-৩৪৫) নকমা মা.চং এর প্রধান হিসেবে এবং আ.খিং এর তত্ত্বাবধায়ক ও অভিভাবক হিসেবে আ.খিং এর সার্বিক দায়িত্বে থাকেন এবং সেই তার এখতিয়ারের মধ্যে আ.উইল ফি সংগ্রহের ক্ষমতাপ্রাপ্ত ব্যক্তি। (এআইআর ১৯৬৯, আসাম, ২২) এই আ.খিং প্রথা এক ধরনের জমিদারী প্রথার মতো। জমিদারী প্রথায় জমিদার তার ভূমি প্রজাদের জন্য চাষাবাদের উদ্দেশ্যে প্রদান করেন এবং সময়ে সময়ে জমিদার তার প্রজাদের কাছ থেকে খাজনা সংগ্রহ করেন। ১৯৪৭ সালে ভারতীয় উপমহাদেশ দুই ভাগে ভারত ও পাকিস্তান হিসেবে ভাগ হলে গারো অধ্যুষিত এলাকাও দুই ভাগে ভাগ হয়- বৃহৎ অংশ ভারতে এবং কিছু অংশ পূর্ব পাকিস্তানে বা বাংলাদেশে পড়ে। ১৯৫০ সালে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন প্রনয়ণ করে জমিদারী প্রথা বিলোপ করে। তখন প্রজারা চলে আসে সরাসরি সরকারের নিয়ন্ত্রণে। প্রজা ও সরকারের মাঝখানে জমিদারের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যায়। এই কারণে প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশে আ.খিং প্রথা ধরে রাখা সম্ভব ছিল না। পরবর্তীতে ১৯৫০ সালের ঐ আইনের উপর ভিত্তি করে ষাটের দশকে এসএ খতিয়ান এবং আশির দশকে আরএস খতিয়ান প্রস্তুত করা হয়। এসএ খতিয়ানে ব্যক্তির নামেই গারোদের ভূমি লিপিবদ্ধ হয়। মাহারীর নামে লিপিবদ্ধ হয়নি। এমনকি, এসএ খতিয়ান প্রকাশিত হওয়ার পর এর বিরুদ্ধে কেউ কোন আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন বলেও শুনা যায় না। এই কারণে এসএ খতিয়ানগুলোর তথ্যই বাংলাদেশের গারোরা মেনে নিয়েছিলেন বলে প্রতীয়মান হয়। এমনকি, আরএস খতিয়ানেও গারোদের ভূমি ব্যক্তির নামে ব্যক্তিগত সম্পত্তি হিসেবে লিপিবদ্ধ হয়। এই দুই খতিয়ানেই আ.খিং প্রথার অস্তিত্ব নেই। অর্থাৎ, এই দুই খতিয়ানে মা.চং বা বিশেষ সম্প্রদায়ের নামে কোন ভূমি লিপিবদ্ধ হয়নি বা লিপিবদ্ধ হওয়ার সুযোগও ছিল না। অন্যদিকে, ভারতে আ.খিং প্রথা থেকে যায় এবং তা সরকার কর্তৃক স্বীকৃতি প্রাপ্তও হয়। অতএব, এটি নিশ্চিত যে, বাংলাদেশের গাারো সমাজে সত্যিকার মাহারী সম্পত্তি বা আ.খিং ভূমির অস্তিত্ব নেই। আছে ব্যক্তিগত সম্পত্তি। (রিছিল, রেভাঃ ক্লেমেন্ট, গারো পুরুষের স্বোপার্জিত সম্পত্তি, জানিরা, সংকলন, ২য় খন্ড, পৃ- ৯১) অর্থাৎ, গারোদের মাহারীগত আবাদযোগ্য ও বসতভিটার ভূমি এসএ জরীপের সময় দখলকার ব্যক্তিদের নামে লিপিবদ্ধ হওয়ায় এবং পরবর্তীতে আরএস জরীপে তাদের নামে বা তাদের ওয়ারিশদের নামে লিপিবদ্ধ হওয়ায় সেই ভূমিগুলো ব্যক্তিগত সম্পত্তি হিসেবে গণ্য হয়। ১৯৫০ সালের আইন অনুযায়ী বনভূমি বা পাহাড় ব্যক্তি মালিকানাধীন থাকার নীতি না থাকায় মাহারীর দখলে থাকা বনভূমি বা পাহাড় সরকারের নামে খাস খতিয়ানভূক্ত হয়ে যায়। বনভূমি বা পাহাড় ছাড়াও মালিকানাহীন অনেক ভূমি ছিল যেগুলো সরকারের মালিকানায় চলে যায়। সেই ধরনের ভূমি গারোদের অনেকেই সরকারের কাছ থেকে বন্দোবস্ত নিয়ে ভোগ-দখল করছে। এছাড়া, এসএ জরীপের পর অনেক গারো পুরুষ নিজেদের পরিশ্রমে ভূমি ক্রয় করেন। গারো পুরুষের এই ধরনের স্বোপার্জিত ভূমি আরএস খতিয়ানে গারো পুরুষের নামেই ব্যক্তিগত ভূমি হিসেবে লিপিবদ্ধ হয়। এছাড়া, গারো পুরুষেরা নিজেদের স্বোপার্জিত সম্পত্তি নিজেদের নামে নামজারি করে খাজনাদিও আদায় করে আসছে।

  •  লেখক:চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট

Facebook Comments

এক নজরে

কিশোর গ্যাং আখ্যা দিয়ে ১৪ আদিবাসী কিশোর আটক

আচিক নিউজ ডেস্কঃ গত মঙ্গলবার রাঙ্গামাটির স্টেডিয়াম এলাকা থেকে মারামারিরত অবস্থায় কিশোর গ্যাং আখ্যা দিয়ে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!